মঙ্গলবার, ২০ আগস্ট, ২০১৯

মন্ত্রীর এ্যকশন!

SONALISOMOY.COM
ফেব্রুয়ারি ৫, ২০১৬

নিউজ ডেস্ক: সদরঘাট থেকে মিরপুর ১২ নম্বরের দিকে ছুটে যাচ্ছিল মিরপুর ইউনাইটেড সার্ভিসের একটি বাস। এটির নিবন্ধন নম্বর ঢাকা মেট্রো-ব-১১-৩৮৯৪। নিবন্ধন থাকলেও বাসটির বাইরের সর্বত্র রং উঠে গেছে। কোথাও কোথাও এবড়োখেবড়ো হয়ে আছে। সামনের গ্লাসের পুরোটাই ভাঙা। তেলচিটে কাপড়ে মোড়ানো আসনগুলোতে বসতে গেলেই নিচে দেবে যায়। বাস ব্রেক কষলেই আসন উল্টে পড়ার জোগাড় হয়।

020300n1
ভ্রাম্যমাণ আদালত বাস থামানোর পর যাত্রীরা সমস্বরে অভিযোগ করল, তাদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া আদায় করা হয়েছে। বাসে ভাড়ার কোনো তালিকাও নেই। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের পাশে ফুটপাতের ওপর বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) পর পর দুটি ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চলে।

এর মধ্যে বিআরটিএর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবুল ফাতেহ মোহাম্মদ সফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে পরিচালিত আদালতের অভিযানকালে (আদালত-৪) পুলিশ সদস্যরা ওই বাসটি থামান। যাত্রীরা এ সময় অভিযোগের ঝাঁপি খুলে ধরে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে। বিআরটিএর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবুল ফাতেহ মোহাম্মদ সফিকুল ইসলাম অভিযোগের প্রমাণ পেয়ে বাসের চালক বি এম নূর আলমকে সাত দিনের কারাদণ্ড দেন।

এই বাসের যাত্রী শরীফুল ইসলাম বলেন, ফার্মগেট থেকে কাজীপাড়ার ভাড়া আগে ছিল ১০ টাকা। এই ভাড়া ২০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছিল। রাজধানীর বাস, মিনিবাস ও সিএনজি অটোরিকশায় ভাড়ানৈরাজ্য চলছেই। অফিস শুরুর আগে ও শেষ হওয়ার পর লোকাল বাসও ‘সিটিং সার্ভিস’ সাইনবোর্ড টাঙিয়ে চালানো হচ্ছে। দুই মাস ধরে বাসের সামনে ‘কম স্টপেজ’ লিখে লোকাল বাসেও ইচ্ছমতো ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।

গত ১ অক্টোবর থেকে বাস-মিনিবাস ও ১ নভেম্বর থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় সরকার ভাড়ার নতুন হার নির্ধারণ করেছে। কিন্তু তা-ও মানছেন না মালিক-চালকরা। অবস্থা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় বিআরটিএ অভিযান জোরদার করে। গতকালের অভিযান চলাকালে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের নিজেই পর পর কয়েকটি সিটিং সার্ভিসের বাসে উঠে ভাড়ার তালিকা আছে কি না খোঁজ নিয়েছেন।
মাওয়া থেকে মিরপুর রুটে চলাচল করে স্বাধীন পরিবহনের বাসগুলো। মাওয়া থেকে ছেড়ে স্থানে স্থানে যাত্রী নামিয়ে মিরপুরের দিকে যাওয়ার পথে অভিযানস্থলে আটকানো হয় স্বাধীন পরিবহনের একটি বাস। তখন বাসে যাত্রী ছিল ১৭ জন। এই বাসেও ভাড়ার তালিকা ছিল না। চালক বিপ্লব শেখ কালের কণ্ঠকে বলেন, তিন বছর ধরে ঢাকায় বড় বাস চালাচ্ছেন বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়াই।
এই দুই অপরাধে একই ভ্রাম্যমাণ আদালত (আদালত-৪) দুই হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেন। পরে বাসটি ছেড়ে দেওয়া হয়। একই আদালত গুলিস্তান থেকে মিরপুরগামী ৩৬ নম্বরের একটি বাস আটকে দেখতে পান, এই বাসেও ভাড়ার তালিকা নেই। ভাড়া আদায় করা হচ্ছে আট থেকে ১৫ টাকা। বাসটি পরে আদালত ডাম্পিংয়ে পাঠিয়ে দেন।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবুল ফাতেহ মোহাম্মদ সফিকুল ইসলাম বলেন, বাসের মালিককে ডেকে জরিমানা আদায় করা হবে। বাসটির রুট পারমিট বাতিল করা হবে। এই আদালত অভিযান পরিচালনা করে গতকাল তিন ঘণ্টায় ১৪টি মামলা করেন। দুটি বাস ও আটটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ডাম্পিংয়ে পাঠানো হয়। ৯ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। জরিমানা আদায় করা হয় দুই হাজার ৮০০ টাকা।

কয়েক ফুটের ব্যবধানে বিআরটিএর অন্য একটি আদালতের (আদালত-৫) অভিযান চলে। অভিযানে নেতৃত্ব দেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কে এম আল আমীন। তিন ঘণ্টার অভিযানে এ আদালত ২১টি মামলা করেন। চার হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। কারাদণ্ড দেওয়া হয় চারজনের। ডাম্পিংয়ে পাঠানো হয় ১২টি গাড়ি। দুপুর সোয়া ১২টায় এ আদালতের অভিযানকালে সদরঘাট থেকে মিরপুর-১২-এর দিকে যাওয়ার পথে ধরা পড়ে বিহঙ্গ পরিবহনের একটি বাস (ঢাকা মেট্রো-ব-১১-৪১২৩)। থামানোর পর বাসে উঠে দেখা গেল এটির রং উঠে গেছে।

সহজেই বোঝা গেল, প্রতিযোগিতা করে রাস্তায় চালাতে গিয়ে কোনো কোনো অংশ চ্যাপ্টা হয়ে গেছে। বাসচালক আল আমীন আদালতের কাছে গাড়ির ফিটনেস সনদ দেখাতে পারেননি। ফলে আদালত তাঁর কাছ থেকে দুই হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেন। ওই বাসে তখন যাত্রী ছিল ২০ জন। অভিযানে বাস আটক করায় তারা নেমে যায়। এই বাসে সদরঘাট থেকে শেওড়াপাড়া যাওয়ার জন্য উঠেছিলেন মুক্তার হোসেন। সদরঘাট থেকে ৩০ টাকা ভাড়া দিয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, বাসে ভাড়া নিলেও সেবা নেই। একই বাসের যাত্রী আবদুর রহমান পিয়াল বলেন, ‘আমার বাসা মিরপুর ২ নম্বরে। সেখান থেকে প্রতিদিন সকালে মিরপুর ১০ নম্বরে গিয়ে বাসে উঠে ফার্মগেটে চলাচল করি।

বাসে দাঁড়িয়ে গেলেও ২৫ টাকা দিতে হয়। অথচ ভাড়া ১২ টাকা। অফিস শুরুর আগে লোকাল বাস সিটিং সার্ভিস হয়ে যায়।’ তিনি জানান, ইটিসি পরিবহন, ইউনাইটেডসহ সব ধরনের সিটিং সার্ভিসের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এসব বাসে দাঁড় করিয়ে যাত্রী নেওয়া হয়। কিন্তু সিটিং বাসে দাঁড় করিয়ে যাত্রী পরিবহনের নিয়ম নেই। সকাল ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে এ আদালত প্রাইভেট হলেও ভাড়ায় চালানোর অপরাধে তিন অটোচালকের কারাদণ্ড দেন।

এসব অটোর ঢাকা শহরে চলাচলের অনুমোদন নেই। এর মধ্যে একজন চালক হক মিয়া পুলিশ ভ্যানে বসেই কালের কণ্ঠকে বলেন, ১৫ দিনের কারাদণ্ড হয়েছে। স্বামী ধরা পড়েছে জেনে তেজকুনীপাড়া থেকে ছুটে আসেন তাঁর স্ত্রী রেজিয়া বেগম। রেজিয়া জানান, দুই বছর ধরে তাঁর স্বামী অটো চালাচ্ছিলেন। বাসের ভেতর সড়কমন্ত্রী : অভিযানকালে সড়কমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সকাল ১১টা ৪০ মিনিটে যাত্রাবাড়ী থেকে মিরপুরগামী শিকড় পরিবহনের (ঢাকা মেট্রো-ব-১১-৩৫৪৯) একটি বাসে উঠে পরিস্থিতি দেখেন।

ওই বাসের চালক ও তাঁর সহকারী ভাড়ার তালিকা দেখাতে পারেননি। এ কারণে একই আদালত চালক মনজুরের কাছ থেকে ৫০০ টাকা জরিমানা আদায় করেন। শিকড় পরিবহনের ওই বাসও ছিল রংচটা। মন্ত্রী আজিমপুর-আব্দুল্লাহপুর রুটের পূর্বাচল সার্ভিসের বাসে (ঢাকা মেট্রো-ব-১১-৭৮৬৪) উঠে এটির ভেতরের অবস্থা দেখেন। এ ছাড়া যাত্রাবাড়ী থেকে মিরপুরগামী শিকড় পরিবহনের অন্য আরো একটি বাসেও ওঠেন মন্ত্রী (ঢাকা মেট্রো-জ-১১-৩৭৪৩)।

ওই বাসে ভাড়ার তালিকা প্রকাশ্যে রাখা ছিল না। ছোট যান নিয়ন্ত্রণ করা হবে : সিএনজিচালিত অটোরিকশা মিটারে চলাচল বাধ্যতামূলক করতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের এ অভিযান অব্যাহত থাকবে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা আমাদের কাজ করে যাচ্ছি। রাতারাতি তো পরিবর্তন সম্ভব নয়, তবে পরিবর্তন হচ্ছে।’ শুক্রবার ও পরীক্ষার সময় ছাড়া যেকোনো সময় এ অভিযান চালাতে বিআরটিএকে নির্দেশ দেওয়া আছে বলেও জানান মন্ত্রী। ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘ঢাকার রাস্তায় লাখ লাখ অবৈধ ছোট যানবাহন রয়েছে। এগুলো নিয়ন্ত্রণে অভিযান চলছে, চলবে।
কালের কণ্ঠ