বুধবার, ২১ আগস্ট, ২০১৯

‘ভোটের আগেই অন্য লড়াইয়ে বিএনপি’

SONALISOMOY.COM
ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০১৬

প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রায় এক মাস বাকি থাকলেও মূল নির্বাচনী লড়াইয়ের আগেই অন্য লড়াইয়ে নামতে হচ্ছে বিএনপিকে।

দলীয় নেতারা এ অভিযোগ করে বলছেন, ভোটের মাঠে টিকে থাকতে সংশ্লিষ্ট এলাকায় প্রতিপক্ষ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ‘হামলা-নির্যাতন-ভয়-ভীতি আর হুমকির’ সঙ্গে রীতিমতো সংগ্রাম করতে হচ্ছে বিএনপির প্রার্থীদের। নেতাকর্মীরা প্রতিরোধের ভুমিকায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কতটুকু স্বচ্ছ হবে, তা নিয়েও রয়েছেন শঙ্কায়।

মোট ছয় ধাপে ৪ হাজার ২৭৯ ইউনিয়নে স্থানীয় সরকারের এ নির্বাচনের আয়োজন হবে এবার। প্রথম ধাপে ৭৫২ ইউপির ভোট হবে ২২ মার্চ। এরপর ৩১ মার্চ ৭১০ ইউপি, ২৩ এপ্রিল ৭১১টি, ৭ মে ৭২৮টি, ২৮ মে bnp৭১৪টি এবং ৪ জুন ৬৬০টি ইউপিতে ভোট হবে।

দলের অভিযোগ, প্রথম দফায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের ‘ক্যাডাররা’ বিএনপির শতাধিক প্রার্থীকে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা এবং প্রত্যাহারের হুমকি দিয়েছে। ইউপি নির্বাচনকে ‘দখলবাজি মহড়া’র একটি উৎকৃষ্ট মডেল বানাতে সরকার ও নির্বাচন কমিশন যমজ ভাইয়ের মতো একযোগে কাজ করে চলছে বলেও দাবি দলটির।

নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির নেতাকর্মীরা ক্ষমতাসীনদের হুমকি-ধমকি ও বাধা ‘প্রতিরোধ’ করছে জানিয়ে দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘এর বিরুদ্ধে আমরা আমাদের মতো করে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করছি। নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছি।’

তিনি বলেন, ‘বিএনপির প্রার্থী সিলেকশন অত্যন্ত ভালো হয়েছে। কোনো ঝামেলা হয়নি। বিদ্রোহী প্রার্থী হয়নি। কিন্তু নির্বাচনের প্রাক্কালে নমিনেশন জমা দেওয়াকে কেন্দ্র করে হামলা, নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। নির্বাচনের আগেই একটি খারাপ আবহ তৈরি করা হচ্ছে।’

‘চিন্তা করেছিলাম, নির্বাচন কমিশন স্বচ্ছতা প্রমানের জন্য ইউপি নির্বাচনকে শেষ সুযোগ হিসেবে নিয়ে প্রমাণ করে যাবে, অন্তত এই নির্বাচন তারা সুষ্ঠু করেছে। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করবে। কিন্তু তা তারা করছে না। অথচ নির্বাচনের সময়ে তারাই সর্বেসর্বা, সর্বময় ক্ষমতার অধিকার; সুতরাং তাদের সেভাবে কাজ করতে হবে।’

আওয়ামী লীগের অধীনে নির্বাচনে গেলে এই ধরনের ঘটনা ‘অস্বাভাবিক’ নয় বলেই মনে করেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান।

তিনি বলেন, ‘এটা তো তাদের (আওয়ামী লীগ) একটি রাজনৈতিক এজেন্ডা। বিএনপির প্রার্থীদের নমিনেশন পত্র কেড়ে নিচ্ছে, তাদের ওপর হামলা করছে; এতে তাদের অতীত কর্মকান্ডের চরিত্রগত মিল তো রয়েছেই। কাজেই এটাকে আমরা অস্বাভাকিভাবে নিচ্ছি না।’

নোমান বলেন, ‘একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগের কোনো কার্যক্রম নেই। সেজন্য এগুলোই তাদের প্রধান কাজ। নির্বাচন স্বচ্ছতার মধ্য দিয়ে হোক তারা চাচ্ছে না।’

বিএনপির দফতর সূত্র জানাচ্ছে, বাগেরহাট জেলার চিতলমারী উপজেলার সব ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের নমিনেশন পেপার জমা দিতে পারেনি। চেয়ারম্যান প্রার্থীদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে আওয়ামী সমর্থকরা ব্যাপক হামলা চালাচ্ছে ও পরিবারের লোকজনদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করছে।

জেলার সদর উপজেলার বারইপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থীর বাড়িতে হামলা চালিয়ে হুমকি দেওয়া হচ্ছে নমিনেশন পেপার প্রত্যাহার করার জন্য। এছাড়া ডেমা, যাত্রাপুর, বেমরতা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের মনোনয়ন পত্র জমা দিতে দেওয়া হয়নি। তাদের বাড়িঘরে গিয়ে ব্যাপক ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে এবং নমিনেশন পেপার প্রত্যাহার না করলে ভয়াবহ পরিণতির হুমকি দিচ্ছে। কচুয়া উপজেলার সদর ইউনিয়ন ও রারীপাড় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীদের মনোনয়ন পত্র জমা দিতে বাধা দেওয়া হচ্ছে।

এছাড়া ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার মোল্লারহাট, রানা পয়সা ও ফুলকাঠি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী আবদুস সালাম, আবদুর রশীদ ও মজিবুর রহমানকে নমিনেশন পেপার জমা দিতে দেওয়া হয়নি। প্রার্থী ও তাদের পরিবারের লোকজনদের হুমকি ও ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে।

দলটির দাবি, খুলনা জেলার তেরখাদা উপজেলার সদর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী মো. মহিবুল্লাহ সোনালী ব্যাংক থেকে জামানতের টাকা জমা দিয়ে ফেরার সময় উপজেলা বিএনপির সভাপতি কাউসার চৌধুরীর হাত থেকে মো. মহিবুল্লার মনোনয়ন পত্র ছিনিয়ে নিয়েছে ক্ষমতাসীর দলের নেতাকর্মীরা। তেরখাদা উপজেলার পাঁচটি ইউপিতে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের মনোনয়ন পত্র জমা দিতে প্রবলভাবে বাধা দেয়া হয়েছে।

এছাড়া সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী যথাক্রমে জুগিখালী ইউপির বর্তমান চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম, সোনাবাড়ীয়া ইউপির বর্তমান চেয়ারম্যান শহীদুল ইসলাম, দিয়াড়া ইউপির বর্তমান চেয়ারম্যান ইব্রাহিম হোসেন, কয়লা ইউপির বর্তমান চেয়ারম্যান আবদুর রকীব এবং কেরালকাতা ইউনিয়নের বিএনপি প্রার্থী জহুরুল ইসলামকে মনোনয়ন পত্র জমা দিতে দেওয়া হয়নি বলে বিএনপির দফতর থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসনকে অবহিত করলেও তারা এর প্রতিকার করতে অপারগতা প্রকাশ করেছে বলে দাবি করছে দলটি।

এদিকে মুন্সীগঞ্জ জেলার সিরাজদী খান উপজেলার জইনশার ইউপি নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী নাজিমুদ্দিনকে মনোনয়ন পত্র জমা দিতে দেয়া হয়নি। আওয়ামী সমর্থকরা তাকে মনোনয়ন পত্র জমা না দেয়ার জন্য হুমকি দিয়েছে।

এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানানো হলেও দৃশ্যত কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি জানিয়ে আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, ‘অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে নির্বাচন কমিশন নয়, সরকারই ইউপি নির্বাচন পরিচালনা করছে।

‘নির্বাচন কমিশনকে বারবার বলেছি। কিন্তু কাজ হচ্ছে না। নির্বাচন কমিশন এখন পর্যন্ত কোনো সমন্বয় সভা পর্যন্ত করেনি। কাজেই বোঝা যাচ্ছে, আগে তো তারা সরকারের আজ্ঞাবহ ছিলো, এখন নির্বাচন কমিশন মনে করছে সরকার যে ডিসিশন দেবে তা বাস্তবায়ন করবে। সেটার জন্যই অপেক্ষ করছে।’

নোমান বলেন, ‘যেখানে এতগুলো জায়গায় নমিনেশন পেপার কেড়ে নেওয়ার মতো স্পেসিফিক (সুনির্দিষ্ট) ঘটনা ঘটেছে, প্রমাণও আছে; তারা কোনো অ্যাকশন (পদক্ষেপ) নিলো না। যখন হলো না তখন মনে হচ্ছে, নির্বাচনের আগেই তারা নির্বাচন করে ফেলে কি না? আগের রাতেই বাক্স ভরে ফেলে কী না?’

এদিকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রথম দফায় মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষদিন ছিল সোমবার। সারা দেশে ২১টি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে একক প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এর মধ্যে বাগেরহাট জেলায় ১৮টি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হতে যাচ্ছেন। এছাড়া ভোলার দক্ষিণ দিঘলদী, মংলার সোনাইলতলা, মাদারীপুরের শিবচরের কুতুবপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী এককভাবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। যাচাই-বাছাই শেষে ওই ২১ জনের মনোনয়নপত্র বৈধ হলে তাদের জয়ী ঘোষণা করা হবে।

‘আওয়ামী লীগের অধীনে নির্বাচন মানেই দখলবাজি আর কেড়ে নেওয়ার মহোৎসব’-মন্তব্য করে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘বর্তমান ইউপি নির্বাচনেও মনোনয়ন পত্র জমা দেওয়ার সময় থেকেই শুরু হয়েছে আওয়ামী শাসকগোষ্ঠীর নির্বাচন বিনাশী চরিত্রের বিভৎস আত্মপ্রকাশ।’

‘জনগণ জানে-আসন্ন ইউপি নির্বাচনের পরিণতি কী হবে। সুতরাং যতক্ষন পর্যন্ত না এই জবরদখলকারি সরকারের পতন ঘটবে, ততদিন পর্যন্ত মানুষ তার অধিকার ফিরে পাবে না এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রে সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের অধিকার নিশ্চিত হবে না। একমাত্র আন্দোলনের পথই হচ্ছে চূড়ান্ত পথ।’

সূএ:রাইজিংবিডি