বৃহস্পতিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

বাগমারার ত্রাশ মেয়র কালাম

SONALISOMOY.COM
ডিসেম্বর ৮, ২০১৬
news-image

রাজশাহী প্রতিনিধি
কথায় কথায় গুলি চালিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি, তুলে এনে মারধর, হত্যার হুমকি— এ যেন নিয়মিত কাজে পরিণত করেছেন রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার তাহেরপুর পৌরসভার মেয়র ও পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ। জমি দখল, অন্যের লাইসেন্সে ঠিকাদারি, পৌরসভায় নিয়োগ-বাণিজ্য চালিয়ে হয়েছেন কোটিপতি। বিপক্ষে কেউ কথা বললেই তার ওপর নেমে আসে নির্মম নির্যাতন। তার নির্যাতন থেকে বাদ যান না আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাও। বাগমারা জুড়ে এখন চলছে আবুল কালামের শাসন।

বাগমারার মানুষ একসময় সর্বহারা আর জেএমবির আতঙ্কে দিন কাটিয়েছেন। সেই আতঙ্ক কমলেও নতুন করে আতঙ্কে পরিণত হয়েছেন কালাম ও তার বাহিনী। কালামের এমন দৌরাত্ম্যে অনেকটা অসহায় স্থানীয় এমপি এমানুল হকও। সন্ত্রাসী কার্যকলাপের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে আলোচনায় আসেন আবুল কালাম আজাদ। ওই সময় তার কাছ থেকে আগ্নেয়াস্ত্রও উদ্ধার করা হয়। তখন তার নামে অস্ত্র আইনে মামলাও হয়। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর মামলাটি রাজনৈতিক মামলা হিসেবে প্রত্যাহার করা হয়। ২০১০ সালে নতুন করে কালাম আলোচনায় আসেন পত্নীতলা এলাকার কলেজ শিক্ষক মুক্তার হোসেনের স্ত্রী শায়লা পারভীনকে ভাগিয়ে এনে বিয়ে করে। শায়লা পারভীন তাহেরপুর পৌরসভার মেয়র ছিলেন এবং প্রয়াত মেয়র আলো খন্দকারের মেয়ে। তবে আবুল কালামের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর। মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর নিজের ভাগ্যে আমূল পরিবর্তন আনেন কালাম। পৌরসভার বড় বড় কাজ সব নিজেই করেন। নাটোরের এক ঠিকাদারের লাইসেন্স ব্যবহার করে সব কাজ বাগিয়ে নেন। তাহেরপুর পৌরসভার ভবন নির্মাণের কাজটিও তিনি করেন। প্রথমে মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি পৌরসভায় নিজের ভাতিজাসহ বিপুল পরিমাণ জনবল নিয়োগ দেন। নিয়োগের নামে হাতিয়ে নেন কোটি টাকা। ২০১১ সালের ২৯ জুন তাহেরপুর উচ্চবিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি না করায় তিনি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আতাউর রহমানকে প্রকাশ্য পিটিয়ে জখম করেন। গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়া এ খবরটি দেশজুড়ে আলোচনার ঝড় তোলে। ২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি মেয়র আবুল কালাম আজাদ অস্ত্রের মুখে তাহেরপুর বাজারের ব্যবসায়ী দুলাল হোসেনকে তুলে এনে আওয়ামী লীগ অফিসে নিয়ে পিটিয়ে জখম করেন। এ সময় আরও দুজন আহত হন। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তার বাহিনীর সদস্যরা গোয়ালকান্দি এলাকায় আওয়ামী লীগের লোকজনকে মারধর করে। এর মধ্যে ইউনিয়নটির সাবেক সভাপতি জাহেদুল ইসলাম, কৃষক লীগের সভাপতি আবদুর রাজ্জাক স্বপনও আছেন।

আবুল কালাম এলাকার নিয়ন্ত্রণে গড়ে তুলেছেন সন্ত্রাসী বাহিনী। এই বাহিনীতে আছে ১০-১৫ জন। এ বাহিনীর হাতে নির্যাতিত হয়েছেন দুর্গাপুর উপজেলার কিসমত গণকৈড় ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবসার আলীর ছেলে কলেজশিক্ষক আসাদুল্লাহ আল গালিব। কিসমত গণকৈড় ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবসার আলী জানান, একটি খালে জাল ফেলাকে কেন্দ্র করে মেয়র কালামের বাহিনীর সদস্যরা তার ছেলেকে মারধর করে। এ ছাড়া গুলি চালিয়ে হত্যার চেষ্টা করে। ফাঁকা গুলি ছুড়ে এলাকায় আতঙ্কের সৃষ্টি করে। গোয়ালকান্দি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি জাহেদুল ইসলাম জানান, কালামের সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে কাজ না করায় কালামের লোকজন তাকেসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মারধর করে। শুধু মারধর নয়, মেয়র কালাম নিজে ও তার লোকজন কথায় কথায় গুলি চালিয়ে এলাকায় আতঙ্কের সৃষ্টি করে রেখেছেন। ২০১৪ সালের ২৯ নভেম্বর শ্রীপুরের খয়রা বিলে গুলি করে এক জেলেকে হত্যা করে তার ক্যাডার বাহিনী। এ ঘটনায় কালামের নামে মামলাও হয়। পরে প্রভাব খাটিয়ে অভিযোগপত্র থেকে নিজের নাম প্রত্যাহার করে নেন। ৭ মে’র স্থগিত হওয়া নির্বাচনে নিজের লাইসেন্স করা আগ্নেয়াস্ত্র প্রকাশ্যে প্রদর্শন করে দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনের প্রচারণায় অংশ নিয়ে দেশব্যাপী আলোচিত হন কালাম। পরের নির্বাচনে জেএমবি ক্যাডার আলমগীর সরকারের পক্ষে প্রচারণা চালান তিনি। এ নিয়ে আওয়ামী লীগের তৎকালীন প্রার্থী আবদুস সালাম নির্বাচন কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগও করেন। ২৫ নভেম্বর অস্ত্রের মুখে তার ক্যাডাররা নুরপুর গ্রাম থেকে পিংকি নামের এক স্কুুলছাত্রীকে অপহরণ করে মেয়র কালামের বাড়িতে নিয়ে যায়। পরে তার দেহরক্ষী সোহেল রানার সঙ্গে মেয়র বিয়ে দেন পিংকিকে। ২৭ নভেম্বর উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ গোলাম সারোয়ার আবুলকে গুলি করে হত্যার হুমকি দেন কালাম। এ ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন গোলাম সারোয়ার আবুল। গোলাম সারোয়ার আবুল জানান, কথায় কথায় গুলি চালানো ও গুলি করে হত্যার হুমকি দেওয়া মেয়র কালামের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তার হাতে আওয়ামী লীগের বহু নেতা-কর্মী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। শুধু মারধর আর গুলি চালিয়ে নয়, জমি দখল করেও আলোচনায় মেয়র কালাম। তাহেরপুর বাজারের কোটি টাকার সম্পত্তি দখল করেন তিনি। আবদুস সালাম নামের এক ব্যক্তি জমিটি এক হিন্দু শিক্ষকের কাছ থেকে কেনেন। কিন্তু মেয়র কালাম জমিটি দখল করে সেখানে মার্কেট নির্মাণ করছেন। এ নিয়ে একাধিক মামলা হয়েছে। আবদুস সালাম জানান, মেয়র তার ক্যাডার বাহিনী দিয়ে জমিটি দখল করে মার্কেট নির্মাণ করছেন। এ নিয়ে পুলিশের কাছে অভিযোগ করেও কোনো লাভ হয়নি। ফলে আদালতে মামলা করেছেন তিনি। তাহেরপুর হাট ইজারাতেও কালাম নিয়েছেন অনিয়মের আশ্রয়। নাটোরের এক ব্যবসায়ীর লাইসেন্সে নিজের লোকজনের নামে ইজারা দিয়েছেন উত্তরাঞ্চলের বৃহৎ এ হাটটি। সাইফুল ইসলাম নামের এক ব্যবসায়ী জানান, হাটটির দরপত্র আহ্বান করা হয় কাগজে-কলমে। কিন্তু কালামের ভয়ে কেউ দরপত্র জমা দিতে পারেন না। ফলে মেয়র তার নিজের লোকজনের নামে হাটটি ইজারা দিয়ে থাকেন। মেয়র আবুল কালাম আজাদ অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘কোনো স্কুলছাত্রীকে অপহরণের সঙ্গে আমার লোকজন জড়িত নয়। এমন কোনো ঘটনাও ঘটেনি। আর যারা গুলি চালানো বা মারধরের কথা বলছে, তারা আমার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার জন্য এমনটা করছে। যারা এমপির দালালি করছে, তাদের বলেছি, আমার বিরুদ্ধে এসব করলে ভালো হবে না।