শনিবার, ১৯ অক্টোবর, ২০১৯

রাইনখোলা বধ্যভূমিতে বিয়ে আর খতনার অনুষ্ঠান

SONALISOMOY.COM
ডিসেম্বর ১০, ২০১৬
news-image

ছোট একটি মাঠ। এর মাঝের একটি অংশ শামিয়ানায় ঘেরা, পাশে বড় বড় হাঁড়ি-পাতিল ছড়ানো-ছিটানো। কাঠের চুলায় একটি সুন্নতে খতনার অনুষ্ঠানের জন্য মুরগি-পোলাও রান্না হচ্ছে। পেছনে ছোট্ট পাঁচ ফুট উঁচু একটি ত্রিভুজ আকৃতির দেয়াল, যার সঙ্গে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ তো আছে। অথচ এই দেয়ালটিই রাজধানীর মিরপুরের রাইনখোলার বধ্যভূমির স্মৃতিস্তম্ভ।

আজ শুক্রবার এই বধ্যভূমিতে গিয়ে সরেজমিন এসব দৃশ্য দেখা যায়। এভাবে এই এলাকার স্বল্প আয়ের মানুষেরা বিয়ে, জন্মদিন, সুন্নতে খতনার মতো সামাজিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
২৩ বছর আগে ১৯৯৩ সালে এই জায়গাটি ছিল ডোবা। পয়োনিষ্কাশন প্রকল্পের কাজ করার সময় এখানকার রিজার্ভারের ভেতর থেকে পাওয়া যায় ৪০০ থেকে ৫০০ মানুষের মাথার খুলি ও প্রচুর হাড়গোড়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় অসংখ্য মানুষকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করে টুকরো টুকরো করে পয়োনিষ্কাশনের এই রিজার্ভারে ফেলে দেওয়া হয়।
একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি প্রকাশিত ‘মিরপুরের ১০ বধ্যভূমি’ পুস্তিকায় এমন তথ্য পাওয়া গেছে। মিরাজ মিজু রচিত বইটিতে লেখা হয়েছে, ‘১৯৭২ সালে ফকির শফিরউদ্দিন (তৎকালীন মিরপুর ও হরিরামপুরের স্বাধীনতা-উত্তর প্রথম চেয়ারম্যান) ও অন্য নেতারা প্রথম রাইনখোলা বধ্যভূমিটি আবিষ্কার করেন।’
তবে ডোবা-নালা থাকায় সেখান থেকে সে সময় লাশ উদ্ধার করা যায়নি। চেয়ারম্যান ফকির শফিরউদ্দিনকে উদ্ধৃত করে ‘মিরপুরের ১০ বধ্যভূমি’ বইয়ে লেখা হয়েছে, ‘হারুন মোল্লা, মান্নান মেম্বারসহ আমরা স্থানীয় নেতৃবৃন্দ বধ্যভূমিটি আবিষ্কার করি। একটি দোতলা স্যুয়ারেজ রিজার্ভার দেখতে পাই। ওপরে একটি পাম্প হাউস ছিল, নিচে রিজার্ভার ট্যাংক। পুরো স্যুয়ারেজ রিজার্ভারটি ছিল মানুষের লাশে ভরা। স্থানীয় মানুষ তাই রিজার্ভারটি ঢেকে দিয়েছিল মাটি দিয়ে।’
জানা যায়, স্যুয়ারেজের রিজার্ভারের ব্যাস ছিল ৫০ ফুট ও গভীরতা ছিল ২৫ ফুট।
রাইনখোলা বধ্যভূমিতে শ্রদ্ধা নিবেদন নয়, আয়োজন করা হয় নানা ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠানের। ছবিটি আজ শুক্রবার সকালে তোলা। ছবি : কমল জোহা খানখুলি ও হাড়গোড় উদ্ধার কাজে এলাকাবাসীর সঙ্গে অংশ নেন তোফাজ্জল হোসেন নামের এক ব্যক্তি। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বেশ কয়েকবার জায়গাটি দখলের চেষ্টা হয়েছিল। ২০০০ সালের এক রাতে সর্বশেষ দখল করার চেষ্টা হলেও তাঁরা আট ফুট উচ্চতার স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেন। পরে মাটি ফেলে জায়গাটি ভরাট করা হয়। তখন উচ্চতা কমে পাঁচ ফুট হয়েছে। জায়গাটি সরকারি খাসজমি। তাই সরকারই পারে স্থানটি সংরক্ষণ করতে। আর আমাদের দাবি, মিরপুর ১০ নম্বরের জল্লাদখানার মতো করে রাইনখোলা বধ্যভূমিটি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক। তা না হলে পুরো জায়গাটি বেদখল হয়ে যাবে।
এদিকে এলাকাবাসী জানান, অনুষ্ঠান আয়োজন করা হলেও জায়গাটি তাদের কারণে রক্ষিত আছে। তাঁরা প্রতিদিন মাঠটি পরিষ্কার করেন। এটি না করলে রাইনখোলা স্তম্ভটি মুছে যেত।