সোমবার, ১৭ জুন, ২০১৯

শিশুবিবাহ ও ধর্ষকদের সুবিধা দিতে আইন?

SONALISOMOY.COM
ডিসেম্বর ১০, ২০১৬
news-image

আমাদের দেশে এমনিতেই বাল্যবিয়ের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এখানে শতকরা প্রায় ৬৫ শতাংশ মেয়ের বয়স ১৮ পার হওয়ার আগেই বিয়ে হয়। অর্থাৎ এ দেশে গড়ে প্রতি তিনটি বিয়ের মধ্যে দুটি বাল্যবিয়ে, আর এর অনিবার্য পরিণতি মেয়েদের অকাল-মাতৃত্ব। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বাড়ছে মা ও সদ্যোজাত শিশুর মৃত্যুর আশঙ্কাসহ নানাবিধ সামাজিক সমস্যা।

সরকার ও বিভিন্ন এনজিওর সচেতনতামূলক কার্যক্রম ব্যাপকভাবে প্রচারিত হলেও কোনোক্রমেই বাল্যবিয়ে রোধ করা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় সরকার দৃঢ়তা দেখাবে, কার্যকর নীতি ও কর্মসূচি গ্রহণ করবে– এটাই ছিল প্রত্যাশিত। কিন্তু আমাদের সরকার উল্টো নিয়ম চালু করতে যাচ্ছে।

সম্প্রতি ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৬’এর খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদন করা হয়েছে। খসড়ায় মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর রাখা হয়েছে বটে, তবে বিশেষ ক্ষেত্রে যে কোনো অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের ‘সর্বোত্তম স্বার্থে’, ‘আদালতের নির্দেশে’ এবং ‘মা-বাবার সম্মতিতে’ বিয়ে হতে পারবে বলে বিধান রাখা হয়েছে।

খসড়া আইনে বলা হয়েছে:

“এই আইনের অন্যান্য বিধানে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, কোনো বিশেষ প্রেক্ষাপটে অপ্রাপ্তবয়স্ক কোনো নারীর সর্বোত্তম স্বার্থে, বিধি দ্বারা নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণক্রমে, বিবাহ সম্পাদিত হইলে উহা এই আইনের অধীন অপরাধ বলিয়া গণ্য হইবে না।”

তার মানে ‘আদালতের নির্দেশে এবং মা-বাবার সম্মতিতে’ একদম ছোট শিশুরও যদি বিয়ে হয়, তবে সেটা জায়েজ হয়ে যাবে। তার মানে, ক্ষেত্রবিশেষে দুগ্ধপোষ্য শিশুর বিয়েও অনুমোদন পাবে।

এই বিধান যুক্ত করার পক্ষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেছেন:

“আমাদের দেশে তো ১০-১১ বছরেও পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে প্রেগন্যান্ট হয়ে যায়। এ সমস্যাগুলো যেহেতু আছে, এটার জন্য একটা ব্যবস্থা।”

সচিব সাহেবের এই যুক্তি খুবই নেতিবাচক। এ থেকে মনে হচ্ছে, ধর্ষণের কারণে কোনো মেয়ে গর্ভবতী হলে তাকেও ওই আইন দেখিয়ে ধর্ষকের সঙ্গে বিবাহে বাধ্য করা হতে পারে। এতে বাল্যবিয়ে নিরোধের মূল উদ্দেশ্যেই ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। কারণ বিশেষ বিধানের সুযোগ নিয়ে শিশুবিয়ে বহাল থাকছে।

প্রশ্ন হল, তাহলে শিশুটির শারীরিক, মানসিক নিরাপত্তার জায়গা বলে কোনো কিছু আদৌ থাকছে কি? নাকি আমরা ভেবে নিয়েছি যে, পিতৃমাতৃহীন মেয়েশিশুর বাল্যবিবাহের পর তার শারীরিক, মানসিক ঝুঁকি নেই বা থাকবে না? কারণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায়, তথা যতদিন সে প্রাপ্তবয়স্ক না হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত সহবাস ঘটবার সম্ভাবনা থাকবে না তথা প্রজনন-প্রক্রিয়ায় সে লিপ্ত হবে না। ফলে সে গর্ভবতী হবে না, প্রসবের ঝুঁকি বলে কিছু থাকবে না, তাই কি?

আবার যদি বুঝে নিতে হয় যে, পিতৃমাতৃহীন অবস্থায় একটি স্থায়ী ঠিকানা নয়, বরং ধর্ষণের মতো নানাবিধ জঘন্য অপরাধের শিকার শিশুদের রক্ষার জন্য, সামাজিক আশ্রয়ের জন্য ‘অপ্রাপ্তবয়স্ক’ নারীর ‘সর্বোত্তম স্বার্থ’ হিসেবে বাল্যবিয়ের ব্যবস্থা চালু রাখা জরুরি, তাহলে তো ধর্ষণ স্বীকৃত হয়ে যায় সমাজে।

অভিজ্ঞতা বলে, এই বিশেষ বিধান যদি যুক্ত করা হয় তাহলে ধর্ষক ও প্রভাবশালীরাই এর সুবিধা নেবে। আমাদের দেশে প্রভাবশালীরা গ্রামে-গঞ্জে এখনও অল্পবয়সী সুন্দরী মেয়েদের জোর করে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়। বিশেষ বিধানের সুযোগে তারা একটি মেয়েকে আটকে রেখে তাকে গর্ভধারণে বাধ্য করতে পারে। কয়েকদিন চুপচাপ থাকার পর প্রভাবশালীরা আইনের মাধ্যমে এই অপরাধেরও বৈধতা নেবে। একটি অবৈধ ব্যবস্থা আইনের মাধ্যমে এভাবে তারা বৈধ করে নেবে! আইনের অপব্যবহারের এমন সুযোগ রাখা হচ্ছে কোন যুক্তিতে?

প্রস্তাবিত এই আইনে মেয়েদের বিয়ের বিষয়ে বাবা-মায়ের মতামতের কথা বলা হয়েছে। ধর্মেও কিন্তু এমনটা নেই। সেখানেও মেয়েদের মতামতের কথা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অথচ এই বিধানে মেয়েদের মতামতের বিষয়টি অবজ্ঞা করা হয়েছে। তার মানে এটা হবে এক ধরনের জোরপূর্বক বিয়ে। আইন করে এ ধরনের বিয়ে সরকার উৎসাহিত করতে চাচ্ছে। এ ধরনের আইন হবে নারী ও শিশু অধিকারের পরিপন্থী। ‘অপ্রাপ্তবয়সী’ একটি মেয়ে বিয়ে না-ও করতে চাইতে পারে। কিন্তু মা-বাবা সম্মতি দিয়েছেন, এই যুক্তিতে ওই মেয়েকে বিয়ে দেওয়া হবে। এতে তার মতপ্রকাশের যে অধিকার, সেটি রক্ষা সম্ভবপর হবে না। আর তা সংবিধানসম্মতও নয়।

সরকারের কর্তাব্যক্তিরা আইনটির পক্ষে খুবই খোঁড়া সব যুক্তি দেখাচ্ছেন। তাদের একটাই কথা, “বিবাহ ছাড়া কেউ প্রেগন্যান্ট (অন্তঃসত্ত্বা) হয়ে গেলে কী হবে?”

এই বক্তব্য মেনে নেওয়া কঠিন। এই বয়সী মেয়েরা কীভাবে নিরাপদ থাকবে, তা সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে। এ ব্যাপারে সরকার দায়িত্ব এড়াতে পারে না। চুরি হয় বলে সরকার কি বলবে যে, সব ঘরে স্থায়ীভাবে তালা লাগিয়ে দাও? আর কেউ অন্তঃসত্ত্বা হলে তাকে বিয়ে দিয়ে দিলেই এ ধরনের সমস্যার সমাধান হবে, না কি সমস্যা আরও বাড়বে? এ রকম আইন হলে অনেক মা-বাবাই এর সুযোগ নেবেন এবং কম বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা আরও বাড়তে পারে।

১৮ বছরের কম বয়সে বিয়ে মানেই হচ্ছে মেয়েশিশুর জীবনকে নানা জটিলতার মুখে নিক্ষেপ করা। প্রথমত, এ বয়সে একটি মেয়ের শারীরিক গড়ন কোনোভাবেই সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকে না। মানসিকভাবেও বিয়ের জন্য প্রস্তুত থাকে না সে। ফলে বিয়ে, স্বামীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক– প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিড়ম্বনা শুরু হয়। এ বয়সে স্বামীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ককে ‘ধর্ষণ’ বলা যায়।

বিয়ের পর থেকে শাশুড়ি ও অন্যরা সন্তান নেওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকে। মানসিকভাবে প্রস্তুত না হওয়ায় অনেক মেয়ে পেটে সন্তান এলেও সেই সন্তান জন্ম দিতে চায় না। অনেকে অনিরাপদ গর্ভপাত করায়। শারীরিক গড়ন প্রস্তুত না থাকায় অনেকের নিজ থেকে গর্ভপাত হয়ে যায়। যাদের গর্ভপাত হয় না, তাদের ক্ষেত্রে অপরিণত সন্তান জন্ম দেওয়া ও প্রসবকালীন খিঁচুনির হার বেড়ে যায়। ফলে মায়ের মৃত্যুহার বাড়ে। বাধাগ্রস্ত প্রসবের কারণে অনেকের ক্ষেত্রে ফিস্টুলার মতো জটিলতাও দেখা দেয়। এ কারণে শুরু হয় দীর্ঘমেয়াদী জটিলতা। মায়ের স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে। ঘনঘন সন্তান জন্মদানের কারণে ক্যান্সারের ঝুঁকিও বেশি থাকে এই মায়েদের।

বিয়ের ক্ষেত্রে ছেলেমেয়ের শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক যোগ্যতা অবশ্যই বিবেচিত হওয়া উচিত। মনে রাখা দরকার যে, মানুষের কল্যাণেই বিধি-বিধান। সুতরাং যে বয়সে বিয়ে করলে নারীর স্বাস্থ্যহানি হবে বা জরায়ুর ক্যান্সার, রক্তশূন্যতা, অপুষ্ট শিশু জন্মের আশঙ্কা ইত্যাদি বাড়বে, সর্বোপরি মা ও শিশুর মৃত্যুঝুঁকি বাড়বে– সে অবস্থায় অবশ্যই বিয়ে করা উচিত নয়।

খসড়া আইনে বাল্যবিয়ে বন্ধে ‘কঠোর’ শাস্তির কথা বলা হলেও অপ্রাপ্তবয়স্করা বিয়ে করলে সর্বোচ্চ ১৫ দিনের আটকাদেশ বা পাঁচ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এটাও খুবই মামুলি একটা ব্যবস্থা। এই আইন পাস হলে ওই ১৫ দিনের আটকাদেশের মধ্য দিয়েই কিছু বাল্যবিয়ে বৈধতা পেয়ে যাবে, যা বর্তমান আইনের চেয়েও বড় দুর্বলতা তৈরি করবে।

আইন শিথিল করা হলে বাল্যবিয়ে বন্ধের লড়াইয়ের পথে তা হবে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। এই আইন সারা দেশে অভিভাবকদের এই বার্তা দেবে যে, অন্তত কিছু ক্ষেত্রে সরকার বাল্যবিয়ে যৌক্তিক মনে করছে।

মেয়েদের বাল্যবিয়ে আমাদের দেশের প্রাচীন সমস্যা। বাল্যবিয়ের জন্য দায়ী দারিদ্র্য, অশিক্ষা ও লিঙ্গবৈষম্য, পুরুষতান্ত্রিক ধ্যানধারণা ও সংস্কার। বস্তুত, গ্রামেগঞ্জে অনেক বাবা-মা মনে করেন যে, মেয়েদের শিক্ষার জন্য টাকাপয়সা খরচ করা মানে অপচয়। তার চেয়ে বরং মেয়েদের অল্পবয়সে পাত্রস্থ করতে পারলে সংসারে একজনের গ্রাসাচ্ছাদনের ভার কমে। আবার বিয়ে দিতে দেরি করা মানেই পাত্রীর ‘চাহিদা’ কমে যাওয়া এবং পাশাপাশি যৌতুকের চাপ বেশি হওয়া।

এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই যে, মেয়েদের বাল্যবিবাহ ঠেকাতে তাদের আরও বেশি করে স্কুলে ভর্তি করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন মেয়েদের স্কুলে পড়াশোনা চালানোর জন্য বাড়তি কিছু সুযোগ-সুবিধা। এ কথা মানুষজনকে বোঝাতে হবে যে, মেয়েদের বাল্যবিয়ে দেওয়া মানে আসলে তাদের শৈশব চুরি করা। নিজের পরিবার থেকে মেয়েটিকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া। আর এই বিষময় পরিণতি মেয়েদের অকাল-মাতৃত্ব, যা প্রসূতি ও সদ্যোজাত শিশুর মৃত্যুর আশঙ্কা অনেক গুণ বাড়িয়ে দেয়। বাল্যবিয়ে নিরোধ করতে প্রয়োজন সমষ্টিগত বহুমাত্রিক লড়াই। সমাজের অনেককেই এতে শামিল হতে হবে।

বাবা-মা, ছেলেমেয়ে, স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্যকর্মী, স্থানীয় স্কুল শিক্ষক, স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষিত সমাজ-সচেতন নাগরিক সবাইকে নিয়ে মেয়েদের বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধে প্রচারাভিযান চালাতে হবে। বাস্তব উদাহরণ দিয়ে সবার সামনে মেয়েদের বাল্যবিবাহের কুফল তুলে ধরতে হবে। সচেতনতা গড়ে তোলাই বেশি জরুরি। আর বাল্যবিয়ে রুখতে যথাযথ আইনি ব্যবস্থাও থাকা দরকার।

আইনের মধ্যেই যদি সর্বনাশের জীবাণু রয়ে যায়, তবে রোগ সারবে কোন ওষুধে?

চিররঞ্জন সরকার

[related_post themes="flat" id="172461"]