বুধবার, ১৬ অক্টোবর, ২০১৯

বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়ার নামে প্রতারণা
১০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এমপি পিনু খানের পিএস

SONALISOMOY.COM
ডিসেম্বর ২৬, ২০১৬
news-image

বাগমারা প্রতিনিধি: রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার কাচারীকোয়ালীপাড়া ইউনিয়নের মোহনপুর গ্রামের বাসিন্দা সায়েম আলী। বিদ্যুৎ সংযোগ পেতে একে-ওকে ধরে না পেরে শেষ চেষ্টা হিসেবে চার মাস আগে উপজেলার বাসুপাড়া ইউনিয়নের বীরকয়া গ্রামের বাসিন্দা ও সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য পিনু খানের কথিত পিএস বাবুল হোসেনকে ৭ হাজার ৫০০ টাকা দেন। মিটার খরচের জন্য দেন আরও ৬০০ টাকা। এখন পর্যন্ত বিদ্যুতের সংযোগ পাননি তিনি। সায়েম জানান, বিদ্যুৎ সংযোগ পেতে কোরবানির ঈদের জন্য জমানো টাকা তিনি বাবুলকে দেন। এভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়ার নামে গ্রামের ১৪৫টি পরিবারের মধ্যে ১৩৭টি পরিবার বাবুলকে অন্তত ১০ লাখ টাকা দেয়। এসব পরিবারের সদস্যরা যুগান্তরের কাছে অভিযোগ করেন, পুরো টাকাই মেরে দিয়েছেন বাবুল।

সাবেক যুবলীগ নেতা ও বাগমারা উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান নাসিমা আক্তারের স্বামী বাবুল হোসেন যুগান্তরের কাছে নিজেকে বগুড়ার সংরক্ষিত আসনের নারী এমপি পিনু খানের রাজনৈতিক একান্ত সচিব (পিএস) বলে দাবি করেছেন। একসময় তিনি সাবেক প্রতিমন্ত্রী জিনাতুন নেসা তালুকদারের ব্যক্তিগত সহকারীও ছিলেন। এ বিষয়ে এমপি পিনু খানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কেন সে টাকা তুলেছে বা কত টাকা তুলেছে, তা আমার জানা নেই। তিনি এর সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত নন দাবি করেন। বাবুল তার পিএস কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এমনিতেই বাবুল আমার সঙ্গে বিভিন্ন কাজকর্ম করে। সাবেক এমপি জিনাতুন নেসা বাবুলকে আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। এরপর থেকে সে আমার সঙ্গে কাজ করে। তবে বাবুল কী কাজ করে- এ বিষয়ে পরিষ্কার করে কিছু বলেননি এমপি পিনু খান।

এ বিষয়ে নাটোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর বাগমারার আঞ্চলিক অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার সফিউল হক জাহাঙ্গীর জানান, গ্রামটিতে সরকারি বিদ্যুতের সংযোগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এতে কোনো টাকা নেয়া হয়নি। স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতেই হয়েছে। তবে বাবুল হোসেন নামে এক ব্যক্তি টাকা নিয়েছেন বলে শুনেছি। কেউ লিখিত অভিযোগ করলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বাবুল হোসেনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, যে কাজ করে তারই সমালোচনা হয়। আমি এলাকার উন্নয়নে বহু কাজ করেছি। গ্রাম্য রাজনীতির কারণে আমাকে দোষ দেয়া হচ্ছে। তবে গ্রামবাসী দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ পেতে ঠিকাদার ও কয়েকজন কর্মকর্তাকে কিছু টাকা দিয়েছে। আমি কোনো টাকা নিইনি। বরং গ্রাহকের মিটারের জন্য আমি নিজে থেকে ৫৫ হাজার টাকা পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে জমা দিয়েছি।

বাগমারার মোহনপুর গ্রামের অন্তত ২৫ জন কাছে অভিযোগ করেন, বাবুল হোসেন কয়েক মাস আগে গ্রামে সভা করে বিদ্যুৎ দেয়ার আশ্বাস দেন। এজন্য খরচ হিসেবে প্রত্যেক গ্রাহকের কাছ থেকে সাড়ে সাত হাজার টাকা করে দাবি করেন। সে মোতাবেক গ্রামের ১৪৫টি পরিবারের মধ্যে ১৩৭টি পরিবারের পক্ষে সাড়ে সাত হাজার করে টাকা দেয়া হয়। তার প্রতিনিধি পরিচয়ে শ্যালক মহসিন আলী ও কামরুল ইসলামের মাধ্যমে টাকাগুলো আদায় করা হয়।

এরপর অক্টোবরে উপজেলার অন্যান্য স্থানের মতো মোহনপুরেও স্বাভাবিক নিয়মে বিদ্যুৎ সংযোগের প্রক্রিয়া শুরু হয়। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, বাবুলকে টাকা না দেয়ায় ওই গ্রামের ৮টি বাড়িতে মিটার স্থাপন করেনি পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ। এরপরই মূলত বাবুলের ঘুষ আদায়ের বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ে।

মোহনপুর গ্রামের বাসিন্দা জাহেদুল ইসলাম, এমদাদ হোসেন ও সায়েম আলী জানান, তারা সাড়ে সাত হাজার টাকা বাবুলকে এবং পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে মিটার বাবদ আরও ৬০০ টাকা জমা দিয়েছেন। টাকা দেয়ার পর তাদের বাড়িতে মিটার লাগানো হয়েছে, তবে সংযোগ দেয়া হয়নি।

ওই গ্রামের বাসিন্দা ও কাচারীকোয়ালীপাড়া ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক জালাল উদ্দিন জানান, তিনিও বিদ্যুতের জন্য টাকা দিয়েছেন। সাবেক এমপি জিনাতুন নেসার ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে বাবুল হোসেন এলাকায় প্রভাবশালী ও তদবিরকারক হিসেবে পরিচিত। এজন্য বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য গ্রামের লোকজন মিলে তাকে টাকা দেয়। তবে তিনি পরে জানতে পেরেছেন, এটা সরকারি বিদ্যুৎ, কোনো টাকা লাগে না। দু’এক দিনের মধ্যে বাবুলের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করা হবে বলে তিনি জানান।

একই গ্রামের মোসলেম আলী, ফসির উদ্দিন ও আমানুল্লাহ অভিযোগ করেন, তারাসহ ৮টি পরিবারের পক্ষে কোনো টাকা দেয়া হয়নি। এ অনিয়মের সঙ্গে পল্লী বিদ্যুতের লোকজনও জড়িত। তাই তাদের বাড়িতে মিটারও লাগানো হয়নি।

এদিকে কাচারীকোয়ালীপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আয়েন উদ্দিন জানান, বিদ্যুতের জন্য বাবুল টাকা নিয়েছেন বলে তার কাছেও লোকজন অভিযোগ করেছেন। এর সত্যতাও পেয়েছেন। বাবুল এটি প্রতারণা করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এ বিষয়ে বাগমারা থানার ওসি সেলিম হোসেন বলেন, আমার কাছে কেউ অভিযোগ করেনি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

উল্লেখ্য, গত বছরের ১৩ মে রাজধানীর ইস্কাটনে এমপি পিনু খানের প্রাডো গাড়ি থেকে তার ছেলে রনির ছোড়া এলোপাতাড়ি গুলিতে দুইজন নিরীহ ব্যক্তি নিহত হন। তখন আলোচনায় আসে এমপি পিনু খানের নাম।