মঙ্গলবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৭

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে জাতিসংঘে নিন্দা প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্র বিরত যেভাবে

SONALISOMOY.COM
ডিসেম্বর ৩০, ২০১৬
news-image

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: একুশে ডিসেম্বর সকালের হাঁটাহাঁটি, বিকালে গলফ খেলা এবং রাতে বন্ধুদের সঙ্গে পারিবারিক নৈশভোজ- এর মধ্যেই ওয়াশিংটনে শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা দলের সদস্যদের সঙ্গে ফোনে আলোচনায় হাওয়াইয়ে অবকাশ যাপনে কিছুটা ছেদ ঘটালেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণকে অবৈধ আখ্যায়িত করে মিশরের তোলা নিন্দা প্রস্তাবের ওপর পরদিন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভোটাভুটি হওয়ার কথা ছিল।
কয়েক মাস ধরেই নিরাপত্তা পরিষদে বিষয়টি নিয়ে কথা চলছিল। টেলিফোনে ওবামা ভোটদানে বিরত থাকার কথাই বলছিলেন। সন্ত্রাসবাদ ও ফিলিস্তিনি সহিংসতার সমালোচনা থাকায় প্রস্তাবটি ‘ভারসাম্যপূর্ণ’ ঠেকে তার কাছে। আর ওই প্রস্তাবের ভাষায় শেষ মুহূর্তের কোনো পরিবর্তনও হয়নি।

ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনসহ অনেকে যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থানে কংগ্রেসে তীব্র প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কার পাশাপাশি ইসরায়েলের বিষয়ে সতর্ক করেন। তবে একটা অবস্থান নেওয়ার সময় এসেছে বলে অধিকাংশই একমত হন। যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমাগত সমালোচনার মধ্যেও পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ইসরায়েলের দ্রুত বসতি সম্প্রসারণ ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের জন্য সমঝোতার আশা ক্ষীণ হয়ে আসছিল। এদিকে পাসের অপেক্ষায় থাকা ইসরায়েলি বিলে এরই মধ্যে ফিলিস্তিনি ভূমিতে নির্মিত বসতির আইনি বৈধতার কথা বলা হয়েছে।

মিশর ছাড়াও জাতিসংঘে তোলা এই প্রস্তাব সমর্থনকারী চারটি দেশ চাইছিল, প্রেসিডেন্ট ওবামা দায়িত্ব ছাড়ার আগেই বিষয়টি নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদে ভোটাভুটি হোক। কেননা এই প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্রের ভিটো শুধু ইসরায়েলি কর্মকাণ্ডকে বৈধতাই দিত না, নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চার বছরে ইসরায়েলকে নিজেদের মর্জি মাফিক চলার সুযোগ করে দিত।

বারাক ওবামার দুই পাশে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু (ছবিতে বাঁয়ে) ও ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস: ছবি- রয়টার্স

বারাক ওবামার দুই পাশে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু (ছবিতে বাঁয়ে) ও ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস: ছবি- রয়টার্স
ওবামা প্রশাসনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, “এই ভোটের প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে তা নিয়ে লোকজন বিতর্ক করেছে। তারা বলছিল, আমরা ভোটদানে বিরত থাকলে ভালোর বদলে মন্দই বেশি হতে পারে। এটা আমাদের রাজনীতি, ইসরায়েলি রাজনীতিতে বার বার উঠে আসবে এবং এ প্রবণতা বাড়তেই থাকবে।

“কিন্তু এ নিয়ে যত খারাপ আলোচনা হওয়ার, তা এরই মধ্যে হয়ে গেছে।”

কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত বিষয়গুলোর অন্যতম ইসরায়েল। তবে ওবামাকে আর কখনও প্রেসিডেন্ট পদে লড়তে হবে না এবং তার আর কিছু হারানোর নেই।

শেষ পর্যন্ত যখন ভোট হল, ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদে তা অনুমোদন পেল। হোয়াইট হাউজ থেকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সুসান রাইসের ফোন কলের মাধ্যমে ওবামার বার্তা পৌঁছেছিল জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত সামান্থা পাওয়ারের কাছে। তিনি হাত উঁচু করে ভোটদানে বিরত থাকার কথা জানান। প্রস্তাবটিও অনুমোদন পায়।

যেমন ভাবা হয়েছিল, প্রতিক্রিয়া এলো সে রকমই। কংগ্রেস সদস্যরা ওবামার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্রকে গুরুত্ব না দেওয়ার অভিযোগ তুললেন। এই পদক্ষেপকে ‘অযৌক্তিক’ বললেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তার সরকার অভিযোগ তুলল- ওই প্রস্তাব নিয়ে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে গোপনে ‘ষড়যন্ত্র’ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ওবামার সহকারীরা।

ওই প্রস্তাবে ভিটোর আহ্বান জানানো ট্রাম্প এক টুইটে তার শপথ পর্যন্ত ইসরায়েলকে ‘শক্ত’ থাকতে বলেছেন। ট্রাম্প স্পষ্টত যুক্তরাষ্ট্রের এই নীতিতে বড় পরিবর্তনের পরিকল্পনা করেছেন। তার প্রধান স্ট্র্যাটেজিস্ট স্টিফেন কে ব্যানন এবং অন্য ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের মধ্যে ওবামা প্রশাসনের সাম্প্রতিক বক্তব্য, বিশেষ করে ইসরায়েল প্রসঙ্গ অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। ব্যানন ও ট্রাম্পের জামাতা জারেড কুশনারই ইসরায়েল বিতর্কে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তারা ইসরায়েলি কর্মকর্তা ও তাদের মিত্রদের ফোন করে আলোচনা এবং বৈঠকের ব্যবস্থা করছেন বলে ট্রাম্প শিবিরের ঘনিষ্ঠ বেশ কয়েকজন জানিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে নেতানিয়াহু: ছবি- রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে নেতানিয়াহু: ছবি- রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্রের জাতিসংঘ ত্যাগ করা উচিত বলে মনে করছেন কি না- বুধবার সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে ট্রাম্পের বক্তব্য, যতক্ষণ পর্যন্ত এই আন্তর্জাতিক সংস্থা সমস্যা তৈরির বদলে তার সমাধান করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এর আবেদন ফুরোচ্ছে না।

“এটা যদি তার সামর্থ্য নিয়ে এগোয়, তাহলে এটা এক বড় জিনিস। যদি তা না করে তাহলে এটা সময়ের অপচয়।”

এদিকে ওবামা প্রশাসনের কর্মকর্তারা মনে করছেন, ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের বিষয়টি নিয়ে জাতিসংঘ প্রস্তাব পাসে প্রশাসন কিছু মাত্রায় স্বস্তিতে আছে এবং ইসরায়েল-ফিলিস্তিন শান্তি চুক্তি আবারও আন্তর্জাতিক আলোচ্য সূচিতে ফিরবে বলে তারা মনে করছেন।

এ বিষয়ে প্রথম ইঙ্গিত মেলে গত সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারের উত্তাপের মধ্যে, দুই প্রার্থী ট্রাম্প ও হিলারি ক্লিনটনের নিউ ইয়র্কে নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকের পরপরই। একটি ইসরায়েলি টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ড্যান শাপিরো বলেন, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকট নিরসনে দুই রাষ্ট্রের সমাধানে পৌঁছাতে সবচেয়ে ভালো উপায় কী হতে পারে তা খুঁজছেন ওবামা।

“এটা নিয়ে আমরা বিবৃতি দিতে পারি বা একটি প্রস্তাব গ্রহণ বা জাতিসংঘে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ হতে পারে… যার পথ ধরে পরবর্তী প্রশাসনও কাজ চালিয়ে যাবে।”

হিলারি ক্লিনটনের নিশ্চিত বিজয় ধরে শাপিরো একথা বলেন; যার অর্থ দাঁড়ায় ওবামা একটি কঠিন বিবৃতি বা প্রস্তাবের ধাক্কা সামলালে তিনি (হিলারি) বিষয়টি নিয়ে এগোনোর জন্য ভালো অবস্থায় থাকবেন এবং ইসরায়েলকে বাস্তব সমঝোতার দিকে নিতে পারবেন। তবে হিলারির পক্ষ থেকে কোনো প্রস্তাবের বিষয়ে আগ্রহ দেখানো হয়নি।

বিশ্বের অনেক দেশ অধিকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ইসরায়েলি বসতি নির্মাণকে ‘অবৈধ’ বললেও দীর্ঘদিন তাদের সঙ্গে সুর মেলায়নি যুক্তরাষ্ট্র।

পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের বসতি নির্মাণের এই চিত্র গত ২২ ডিসেম্বরের: ছবি- রয়টার্স

পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের বসতি নির্মাণের এই চিত্র গত ২২ ডিসেম্বরের: ছবি- রয়টার্স
কোন জমিতে কার কতটুকু অধিকার সে বিষয়ে ইসরায়েল-ফিলিস্তিনের মধ্যে এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আট বছর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনকালে ওবামা চূড়ান্ত সমাধানের জন্য ইসরায়েল-ফিলিস্তিনের মধ্যে সরাসরি আলোচনা শুরুর চেষ্টা চালিয়েছেন, যার অংশ হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি দুই বছর ধরে ব্যাপক চেষ্টা চালিয়েছেন।

ওবামার পুরো সময়টায় যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন বিষয়টি নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদকে এড়িয়ে গেছে, বিষয়টি ভোটাভুটিতে আসার আগে সমর্থকদের সরিয়ে এনেছে।

ফিলিস্তিন সব সময় নিরাপত্তা পরিষদের ভোটের জন্য চেষ্টা চালিয়েছে, যদিও ওবামা প্রশাসনের কাছে অধিকাংশ প্রস্তাবই ‘এক পাক্ষিক’ বিবেচিত হয়েছে। পাশাপাশি ওবামা প্রশাসন মনে করছে, দুই পক্ষকে আবার যদি আলোচনার টেবিলে আনা যায়, তাহলে এ নিয়ে আলোচনা বাড়ানোর কোনো প্রশ্ন ওঠে না।

তবে দ্রুত বসতি সম্প্রসারণ এবং দুই রাষ্ট্র সমাধান কার্যত মৃত বলে নেতানিয়াহুর ডানপন্থি জোটের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বক্তব্য, অন্যদিকে নতুন একটি প্রস্তাবের জন্য নিরাপত্তা পরিষদের অন্য সদস্যদের তোড়জোড়- এ প্রেক্ষাপটে সবার কথা শুনছিল ওবামা প্রশাসন।

৮ নভেম্বরের ভোটে ট্রাম্পের বিজয়ের পর ইসরায়েলের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয় নতুন প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার আগে ওবামা কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেন ভেবে।

গত জুন থেকে নতুন একটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চালাচ্ছিল ফিলিস্তিন ও মিশর। একই সময় এ বিষয়ে নতুন একটি খসড়া তৈরি করে নিউ জিল্যান্ড, যারা যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধে আগের প্রস্তাব ফিরিয়ে নিয়েছিল।

ডিসেম্বরের প্রথম থেকে দুই খসড়াই নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বিতরণ শুরু হয়। নিউ জিল্যান্ডের সঙ্গে সরাসরি এবং মিশরের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র জানিয়ে দেয়,ইসরায়েলি বসতির নিন্দার পাশাপাশি ফিলিস্তিনি সহিংসতার সমালোচনার প্রতিফলনে প্রস্তাবটি আরও ভারসাম্যপূর্ণ না হলে তারা তা বিবেচনায়ও নেবে না।

এ জাতীয় আরও খবর