মঙ্গলবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৭

সারা দেশেই রোহিঙ্গারা ছড়িয়ে আছে

SONALISOMOY.COM
ডিসেম্বর ৩০, ২০১৬
news-image

নিজস্ব প্রতিবেদক: শুধু সীমান্তবর্তী জেলাগুলো নয় সারা দেশেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে রোহিঙ্গারা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে।

প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল বাংলাদেশের সীমাবর্তী জেলাগুলোতে রোহিঙ্গারা আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এসব নাগরিক গণনা করতে গিয়ে সরকার দেখছে মাকড়সার জালের মতো দেশজুড়েই ছড়িয়ে রয়েছে তারা।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, চলতি বছরের অক্টোবর থেকে দেশে উল্লেখযোগ্য হারে রোহিঙ্গারা অনুপ্রবেশ করছে। এই ধারা অব্যাহত রয়েছে এখনো।

মন্ত্রণালয় বলছে, গত তিন মাসে বাংলাদেশে প্রায় ৫০ হাজার রোহিঙ্গা প্রবেশ করেছে। আনুষ্ঠানিকভাবে গত কয়েকদিনে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে দুদফা মিয়ানমার সরকারকে জানানোও হয়েছে। যদিও দেশটির পক্ষ থেকে এখনো কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

তবে বৃহস্পতিবার দেশটির রাষ্ট্রদূত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে, রোহিঙ্গা শরণার্থী ইস্যুতে মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই তার বিশেষ দূত বাংলাদেশে পাঠাবেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আশা করা হচ্ছে, বিশেষ দূতের আগমনের মাধ্যমে শরনার্থী ইস্যুর সমাধানের প্রক্রিয়া শুরু হবে। কিন্তু সংশয় দেখা দিয়েছে রোহিঙ্গাদের গণনা করার লক্ষ্যে পরিচালিত শুমারির ফলাফল দেখে। এমনকি রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ অব্যাহত থাকায় সরকারের ঘোষিত ডেডলাইনে শুমারিটি প্রকাশও করতে পারছে না পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মহাপরিচালক মোহাম্মদ আবদুল ওয়াজেদ বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চাহিদা অনুযায়ী আমরা এ শুমারি পরিচালনা করেছি। এর ফলাফল সম্পর্কে ওখান থেকেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বিবিএস আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করবে কি না সেটিও আমার জানা নেই।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর সূত্র জানিয়েছে, এই শুমারির বিভিন্ন ফলাফলের মধ্যে অন্যতম একটি ফলাফল হিসেবে সংস্থাটি পেয়েছে, ‘রোহিঙ্গারা শুধু নির্দিষ্ট কয়েকটি জেলায় বসবাস করছে না। বরং তারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে সারা দেশে।’ জরিপের এই তথ্যের ভিত্তিতে নতুন সংশয়ে পড়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তথা বাংলাদেশ সরকার।

মন্ত্রণালয়ের একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, মিয়ানমারের সামরিক সরকারের পরিবর্তনের পর নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে দেশটির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ। একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে সীমান্ত নিয়েও বেশ কিছু প্রস্তাবনা রয়েছে বাংলাদেশ সরকারের। এর মধ্যে রয়েছে সীমান্তে যৌথ টহল, অমীমাংসিত সীমান্ত চিহ্নিতকরণ, ভ্রমণের বৈধ কাগজপত্র ছাড়া মিয়ানমারের নাগরিকদের বাংলাদেশে প্রবেশ ঠেকানো ইত্যাদি। কিন্তু রোহিঙ্গাদের সংখ্যা নিয়ে প্রাপ্ত নতুন এই তথ্য সব পরিকল্পনা এলোমেলো করে দিতে পারে।

যদিও এসব বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (দ্বিপক্ষীয়, কনস্যুলার) কামরুল আহসান রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘মিয়ানমার থেকে আসা এসব নাগরিকের বিষয়ে একটি সিদ্ধান্তে আসতে চাচ্ছে সরকার। এ জন্য শিগগিরই আলোচনা হবে দেশটির সঙ্গে।’

এদিকে অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করে দেশের এমন একটি প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, এসব নাগরিক ফেরত পাঠানোর বিষয়ে রোহিঙ্গা শব্দের পরিবর্তে ‘অনিবন্ধিত মিয়ানমারের নাগরিক’ ব্যবহার করা হচ্ছে। এ জন্য শুমারিতে রোহিঙ্গার পরিবর্তে টেকনিক্যালি শব্দটি ব্যবহার করা হচ্ছে। যাতে শরনার্থীর পরিবর্তে নাগরিক হিসেবে তাদের ফেরত পাঠানো সহজ হয়।

চলতি ডিসেম্বর মাসেই শুমারির ফলাফল প্রকাশ করার কথা ছিল। কিন্তু শুমারিটি পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা পরিসংখ্যান ব্যুরো ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপে জানা গেছে, যে উদ্দেশ্যে শুমারিটি শুরু করা হয়, নতুন করে রোহিঙ্গা প্রবেশের কারণে তা রহিত হয়েছে। তাই এখন এই শুমারির উপযোজিতা নিয়েও শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।

বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী মিয়ানমারের অনিবন্ধিত নাগরিকের সংখ্যা কত, এর কোনো সঠিক হিসাব সরকারের জানা নেই। তাই রোহিঙ্গা বলে পরিচিত এ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা নির্দিষ্ট করতে প্রথমবারের মতো ‘বাংলাদেশে অবস্থানরত অনিবন্ধিত মিয়ানমার নাগরিক শুমারি-২০১৫’ নামে একটি প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। এতে খরচ হচ্ছে ২১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। ২০১৫ সালের এপ্রিল থেকে চলতি বছরের জুলাই মেয়াদে এটি বাস্তবায়ন শুরু করে পরিসংখ্যান ব্যুরো। পরবর্তীকালে চলতি ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়।

শুমারির আওতায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও পটুয়াখালী- এ ছয় জেলায় থাকা রোহিঙ্গাদের গণনা করা হয়েছে। ২ থেকে ১৪ জুন গণনা কাজ পরিচালনা করা হয়। প্রায় ৩ হাজার গণনাকারী, সুপারভাইজার, জোনাল অফিসার, উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় সমন্বয়কারী এ কাজে যুক্ত ছিলেন। মাঠ পর্যায়ের কাজ শেষে বর্তমানে টেবিল ওয়ার্ক চলছে। এরপরই ফলাফল যাবে ন্যাশনাল টাস্কফোর্সের কাছে। ওই কমিটিই সিদ্ধান্ত নেবে কীভাবে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হবে।

বিবিএস সূত্র জানায়, এ শুমারিতে শুধু রোহিঙ্গাদের সংখ্যা নির্ণয়ই নয়, তাদের জীবনযাপনের যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করা হয়। তারা মিয়ানমারের কোন অঞ্চল থেকে এ দেশে এসেছে, কেন এসেছে, বাংলাদেশে তাদের জীবিকা নির্বাহ হয় কীভাবে, পরিবারের সদস্য কত, এসব তথ্যও সংগ্রহ করা হয়।

সূত্রটি বলছে, এ শুমারির গণনাকালীন যেসব এলাকায় রোহিঙ্গা পাওয়া গেছে তাদের আত্মীয়স্বজন আছে কি না এ রকম প্রশ্নও করা হয়। তখন অনেকের আত্মীয় দেশের বিভিন্ন স্থানে রয়েছে বলে তারা জানায়। এ থেকে অনুমান করা হচ্ছে রোহিঙ্গারা সারা দেশেই রয়েছে।

একই কথা বললেন অভিবাসন ও উদ্বাস্তু বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তাদের অনেকেই (রোহিঙ্গা) ৪০-৫০ বছর ধরে এদেশে আছেন। অনেকের জন্ম এখানেই। কেউ কেউ সরকারি চাকরিও করছেন। তা ছাড়া রেহিঙ্গারা এখন আর কোনো এলাকায় সীমাবদ্ধ নেই। তারা সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।’

এ জাতীয় আরও খবর