বুধবার, ১৭ অক্টোবর, ২০১৮

বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষায় শতভাগ উপবৃত্তির সুফল
‘শিক্ষা নিয়ে গড়ব দেশ শেখ হাসিনার বাংলাদেশ’

SONALISOMOY.COM
সেপ্টেম্বর ৭, ২০১৮
news-image

ওসমান গনি: এই শ্লোগানকে সামনে রেখে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা এগিয়ে চলেছে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মাত্র দেড় বছরের মধ্যে একটি ঘোষণার মাধ্যমে ১লা জুলাই ১৯৭৩ সালে ৩৭,৬১০টি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করেন। তাঁর সুযোগ্য কন্যা বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দীর্ঘ ৪০ বছরের ব্যবধানে ১ জানুয়ারী ২০১৩ সালে ২৬,১৯৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করেন। এরশাদ সরকারের আমলে প্রায় ১২৯৬ টি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হয়। বর্তমানে দেশে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫০৯৯ টি(সূত্র: বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা -২০১৮) এবং নিবন্ধনকৃত বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৮০টি (সূত্র: বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০১৭)।

বাংলাদেশের শিক্ষার উন্নয়নে সবার আগে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পদক্ষেপ গ্রহণ করে ছিলেন। তিনি সবার আগে প্রাথমিক শিক্ষার উপর গুরুত্ব দিয়ে ছিলেন। স্বাধীনতার দেড় বছরের মধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলোকে জাতীয়করণ করে ছিলেন। আর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আর্থ-সামাজিক ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে ছিলেন। একটি দেশের প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়ন করতে পারলেই শিক্ষার অন্যান্য স্তরেরও উন্নয়ন করা সম্ভব তিনি উপলব্ধি করতে পেরে ছিলেন। কারণ প্রাথমিক শিক্ষার উপর ভিত্তি করেই মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও উচ্চ স্তরের শিক্ষা নির্ভর করে।

বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে বিভিন্নমুখী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। বিশেষ করে গ্রামের অসহায় ও গরিব শিক্ষার্থীদের শিক্ষায় সহায়তা করার জন্য অনেক সময় বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস দেওয়া হয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী ও ঝরে পড়া রোধ করার জন্য ১৯৯৩ সালে খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা কর্মসূচী চালু করা হয়। খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা কর্মসূচীর আওতায় দরিদ্র ও অসহায় শিক্ষার্থীদের ১৫ কেজি গম দেওয়া হয়। দেশের কোন কোন বিশেষ এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা অর্থাৎ স্কুল ফিডিং করা হয়। সরকার ২৮ সেপ্টেম্বর ২০০২ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের গুণগত ও পরিমানগত শিক্ষার মান বৃদ্ধির জন্য শিক্ষার জন্য খাদ্য কর্মসূচীর পরিবর্তে প্রাথমিক শিক্ষার জন্য উপবৃত্তি প্রকল্প চালু করে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে উপবৃত্তি দেওয়া হতো পূর্বে ৫০% শিক্ষার্থীদের। উপবৃত্তি পাওয়া শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে কমপক্ষে প্রতি মাসে ৮৫% উপস্থিত হওয়া বাধ্যতামূলক এবং এসমস্ত শিক্ষার্থীরা অবশ্যই গরিব ও মেধাবি হতে হবে। শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি দেওয়ার ফলে গরিব ও অসহায় পরিবারের শিক্ষার্থীরা আরও বিদ্যালয়মুখী হতে থাকে। এর ফলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর উপস্থিতির হার বেড়ে যায় এবং ঝরে পড়ার হার কমতে থাকে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫০% শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির তালিকা তৈরি করতে গিয়ে অনেক সময় প্রধান শিক্ষকসহ সহকারী শিক্ষকগণ নানা ধরণের সমস্যায় পড়তেন। অনেক গরীব, অসহায় অথচ মেধাবী শিক্ষার্থীরা উপবৃত্তির তালিকা থেকে বাদ পড়তো। অনেক সময় এ নিয়ে শিক্ষার্থীরা ও অভিভাবকেরা মিশ্র প্রতিক্রিয়া করতো। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছর থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১০০% উপবৃত্তি চালু করায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রতিটি শিক্ষার্থী উপবৃত্তির আওতায় এসেছে। এখন প্রাথমিক বিদ্যালয়গামী ৬-১০+ বছর সকল শিক্ষার্থী উপবৃত্তি পাচ্ছে। এমনকি প্রাক-প্রাথমিক শিশুদেরও উপবৃত্তি দেওয়া হচ্ছে। আমি একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও মাননীয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীকে এই ধরণের শিক্ষাবান্ধব উদ্যোগ গ্রহণের জন্য ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি।

শতভাগ উপবৃত্তি চালু হওয়ার ফলে বিদ্যালয়গামী সকল শিক্ষার্থীরা উপবৃত্তির আওতায় এসেছে। এখন ধনী, গরীব, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সকল শিক্ষার্থীরা একই সমান সুযোগ সুবিধা ভোগ করছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শতভাগ উপবৃত্তি দেওয়ার ফলে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষা গ্রহণের প্রতি আগ্রহ আরও বেড়ে গেছে। শতভাগ উপবৃত্তি দেওয়ার জন্য শিক্ষায় দুই ধরণের পরিবর্তন এসেছে। একটি গুণগত এবং আরেকটি হলো পরিমাণগত। বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার বেড়েছে আর উপস্থিতির হার বেড়ে যাওয়ার ফলে শিক্ষার গুণগত মানেরও পরিবর্তন হয়েছে।

সরকার প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণির এক সন্তানের জন্য ৫০ টাকা, দুই সন্তানের জন্য ১০০ টাকা, তিন সন্তানের জন্য ১২৫ টাকা এবং চার সন্তানের জন্য ১৫০ টাকা হারে উপবৃত্তি প্রদান করছে। উপবৃত্তির অধিনে এক সন্তান বিদ্যালয়ে প্রেরণের জন্য মাসিক ১০০ টাকা এবং একাধিক সন্তানের জন্য মাসিক ১২৫ টাকা হারে উপবৃত্তি প্রদান করছে। প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের এই বৃত্তির হার এক, দুই, তিন ও চার সন্তানের জন্য যথাক্রমে ১০০, ২০০, ২৫০ এবং ৩০০ টাকা।
সরকার ২০১৭ সালের জুলাই মাস থেকে দেশের প্রতিটি পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশন এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরও উপবৃত্তির আওতায় নিয়ে এসেছে। এই উদ্যোগ পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশন এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা প্রসারে একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। কারণ পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশন এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলোতে এর আগে কোন উপবৃত্তি দেওয়া হতো না। এর ফলে পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশন এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গরীব ও অসহায় পরিবারের শিক্ষার্থীরা উপবৃত্তি থেকে দীর্ঘদিন বঞ্চিত হয়।

সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকা সরাসরি মোবাইলের মাধ্যমে অভিভাবকদের কাছে পৌছে দেওয়ার ব্যবস্থা করছে। যাতে কোন ভাবে উপবৃত্তির টাকা পেতে অভিভাবকদের কোন ধরণের সমস্যায় পড়তে না হয়। তারপরও অনেক অভিভাবক উপবৃত্তির টাকা পাচ্ছে না। এই ব্যাপারে কর্তৃপক্ষকে আরও জোরালো মনিটরিং চালাতে হবে এবং আমি মনে করি কোন অভিভাবক যদি পূর্বের কিস্তির টাকা না পায় তাহলে পরের কিস্তির সাথে পূর্বের কিস্তির টাকা পাওয়ার ব্যবস্থা করলে অভিভাবকরা উপকৃত হবে।

সরকার ২০১৮ সাল থেকে বাংলাদেশের সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে “মিড ডে মিল” চালু করেছে। যাতে বিদ্যালয়ে অবস্থানকালীন কোন শিক্ষার্থী দুপুরের খাবার থেকে বঞ্চিত না হয়। শতভাগ উপবৃত্তি শিক্ষার্থীদের ‘মিড ডে মিল’ এর ক্ষেত্রে অনেকাংশে সহায়তা করছে। আমি মনে করি, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকার পরিমাণ বাড়ালে ‘মিড ডে মিল’ সহ শিক্ষা সহায়ক উপকরণ ক্রয়ে শিক্ষার্থীদের অনেক উপকার হবে। বিষয়টি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও মাননীয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর সদয় দৃষ্টি কামনা করছি। যাতে শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকার পরিমাণ বাড়ানো হয়।

আজকের শিশু আগামী দিনের নাগরিক। যে শিশু আজ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তারাই আগামী দিনের বাংলাদেশ বিনির্মান করবে। তারাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ২০৪১ সালের উন্নত রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন বাস্তবায়নে সহায়তা করবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ক্ষুধা, দারিদ্রমুক্ত ও শোষণহীন সোনার বাংলাদেশ গঠনে সহায়তা করবে। সেই শিশুদের সঠিকভাবে গড়ে তোলতে পারলেই পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও কল্যাণকর আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত হবে।

লেখক, মোঃ ওসমান গনি

সহকারী শিক্ষক, মচমইল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাগমারা, রাজশাহী