রবিবার, ১৮ আগস্ট, ২০১৯

নেতায় হতাশ নড়িয়াবাসী, সহায়তা চায় প্রধানমন্ত্রীর

SONALISOMOY.COM
সেপ্টেম্বর ৮, ২০১৮
news-image

সাকিব আল রোমান, নড়িয়া থেকে ফিরে : বর্তমানে চারদিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আমেজ। পিছিয়ে নেই শরীয়তপুর-২ আসনে অবস্থিত নড়িয়াও। তবে, পদ্মার ভাঙ্গনে স্থানীয়দের মনে দেখা দিয়েছে নতুন আতঙ্ক। নির্বাচনের আগ পর্যন্ত ভিটে-মাটি থাকবে কিনা এ নিয়েই ভয় এ এলাকার মানুষের মনে। পদ্মা নদীর ভাঙন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। গৃহহীন হয়েছে হাজারও পরিবার। গত পাঁচ বছরে গৃহহীন হয়েছে ২১ হাজার পরিবার। দীর্ঘদিন স্থানীয় নেতাদের উপর আস্থা রেখেছিল নড়িয়াবাসী কোন ফল মেলেনি ভাগ্য পরিবর্তনে তাই বর্তমানে একপ্রকার হতাশাগ্রস্থই বলা যায়। তাদের দাবি, যদি প্রধানমন্ত্রী নড়িয়া সফর করেন তবেই মিলবে ত্রাণ হবে বেড়িবাঁধ।

শরীয়তপুরের জাজিরা ও নড়িয়া উপজেলাটির অধিকাংশ এলাকা জুড়ে পদ্মা নদী। জাজিরার পালেরচর থেকে নড়িয়ার সুরেশ্বর পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে পদ্মার ভাঙন যেন সর্বহারা করার যমদূত। সবচেয়ে বেশি ভাঙন হচ্ছে নড়িয়ার মোক্তারেরচর, কেদারপুর, চরআত্রা, নওপারা ও ঘড়িসার, জাজিরার কুণ্ডেরচর, বড়কান্দি ও জাজিরা ইউনিয়নে। শরীয়তপুরের নড়িয়ায় পদ্মা ভয়াল গ্রাসে গত তিন দিনে ৭ টি বহুতল ভবন নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এছাড়াও গত আড়াই মাসে নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে প্রায় শতাধিক পাকা ভবন সহ শত শত একর জমি দু’শ বছরের পুরনো মুলফৎগঞ্জ বাজারের একাশং। এতে গৃহহারা হয়ে প্রায় ছয় হাজারের বেশি পরিবার। এছাড়াও কয়েক কিলোমিটার পাঁকা সড়কও বিলীন হয়েছে নদীগর্ভে। হুমকির মুখে রয়েছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সহ ও নড়িয়া উপজেলা শহর।

আমাদের প্রতিবেদক নড়িয়া থেকে ফিরে জানিয়েছেন, নড়িয়ায় ব্যাপক পদ্মা নদী ভাঙন অব্যাহত আছে। নদীতে তীব্র গত তিন দিনের ভাঙনে ২শ বছর আগের পুরনো নড়িয়ার ঐতিহ্যবাহী মুলফৎগঞ্জ বাজারটির বৃহৎ একাংশ নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এতে ৭টি বহুতল ভবন রয়েছে। সেগুলো হলো- মুলফৎগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ী হাজী নূর হোসেন দেওয়ানের তিন তলা বিশিষ্ট দেওয়ান ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনষ্টিক সেন্টার ও একটি মার্কেট, পাশেই তার ভাই কেদারপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ইমাম হোসেন দেওয়ান এর তিন তলা বিশিষ্ট একটি মার্কেট, মুলফৎগঞ্জ বাজারের ব্রিজের পশ্চিম পারে আসাদুজ্জামান বিপ্লবের ১ তলা বিশিষ্ট বেপারী মাকেট, সবুজ হাওলাদারের তিন তলা বিশিষ্ট লাইফ কেয়ার হসপিটাল, বাজারের আরও বেশ কয়েকটি ভবন সহ প্রায় অর্ধ দোকান নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এর আগে বাশঁতলা এলাকায় মুন্নি খান নামে এক ব্যক্তির গাজী কালু ভবন নামে একটি চারতলা বিলাস বহুল ভবন, পাশ্ববর্তী মসজিদ সহ আরও একটি ভবন নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে গেছে।

অন্যদিকে, আর মাত্র কয়েক ফুট ভাঙলেই নদী গর্ভে চলে যাবে নড়িয়া বাসীর একমাত্র চিকিৎসা সেবা স্থল নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি। ইতোমধ্যে হাসপাতালের মালামাল ও রোগীদের অন্যত্র বিভিন্ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে সরিয়ে নেয়া হয়েছে।

এ ব্যাপারে স্থানীয়দের প্রশ্ন করলে তারা জানান, ভাই, বেড়িবাঁধ চাইতে চাইতে এখন প্রায় ক্লান্ত আমরা। উল্টো প্রশ্ন ছুড়ে দেন কার কাছে চাইবো? সব নেতাই আমাদের আশ্বাস দিয়েছে। এবার না হয় নতুন মনোনয়ন প্রত্যাশীরা যুক্ত হয়েছেন। কিন্তু তারা যে এবার নির্বাচন করবেন তা তো দীর্ঘ দিনের পরিকল্পনা ছিল কেন তখন থেকে জনগনের কথা ভাবেনি তারা? এখন চাইলেও তো সম্ভব নয়। আর আমরা এখন আর কোন নেতার কাছে চাইনা। শুনেছি শেখ হাসিনা অনেক দয়াবান। কখনও দেখিনি। পারলে তার নজরে দিন অথবা তাকে নড়িয়া সফর করার অনুরোধ করুণ। দৈনিক আমাদের ছবি তুলে নিয়ে মিথ্যে শান্তনা আর দিয়েন না।

স্থানীয় এক নেতা জানান, আমরা বর্তমানে নদী ভাঙা মানুষ। নদীতে আমাদের সবকিছুই বিলিন হয়ে গেছে। এ বছর পদ্মা নদীর ভাঙনে কিছুদিন আগে বিলীন হয়ে গেছে আমাদের বসতবাড়ীসহ ফসলি জমি। এক সময় নলতা-কেদারপুরকে ইতালীপাড়া বলে চিনতো আর এখন নদী ভাঙ্গা। কথাটুকু বলেই চোখেন পানী ছেড়ে দেন তিনি।

এ ব্যাপারে কেদারপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ইমাম হোসেন দেওয়ান মোবাইল ফোনে বলেন, নদীতে আমাদের ঘর-বাড়ি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সব শেষ! আমরা নিঃস্ব। কিছুদিন আগেও আমার সব ছিলো আজ কিছুই নাই। অন্যের বাড়ীতে আশ্রয় নিয়ে কোনমতে অসহায়ের মতো জীবন-যাপন করছি।

তিনি আরও বলেন, এ বছর সহ বিগত কয়েক বছরের ভাঙনে আমাদের দেওয়ান পরিবারের প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। বাপ-দাদাদের জায়গা-জমি যা ছিলো সবই নদীতে ভাইঙা নিয়া গেছে। এখন আমাদের থাকার মতো জায়গা টুকু নেই। তাই সরকারের কাছে আমার বিনীত অনুরোধ। সরকার যদি আমার থাকার জন্য কিছু খাস জমি দিতো তাহলে সেখানে গিয়ে ভাইদের কে নিয়ে থাকতে পারতাম। এভাবে অন্য মানুষের বাড়ীতে আর কতদিন থাকতে হবে জানিনা!

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মুনীর আহম্মেদ খান বলেন, হাসপাতালের পিছন দিক দিয়ে দেয়াল ভেঙে একটি বিকল্প রাস্তা বের করা হয়েছে। সেখান দিয়ে কিছু জিনিস-পত্র চাকধ, নড়িয়াসহ বিভিন্ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে নিচ্ছি এবং রোগীদের কে চিকিৎসা সেবা দেয়ার জন্য আমাদের হাসপাতালের ডাক্তারদের আবাসিক কোয়াটারের নিচ তলায় ১০টি ব্যাড বসানো হয়েছে।

শরীয়তপুর পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী বিশ্বজিত বৈদ্য বলেন, পদ্মা নদীর ভাঙন রোধে গত পাঁচ বছরে জাজিরা ও নড়িয়ায় কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। জাজিরার কুণ্ডেরচর থেকে নড়িয়ার সুরেশ্বর লঞ্চঘাট পর্যন্ত ৯ কিলোমিটার এলাকায় বাঁধ নির্মাণ ও চর খনন করার একটি প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশন থেকে একনেকে যাওয়ার অবস্থায় রয়েছে। ২০১৩ সাল থেকে প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। ১২৮০ কোটি টাকার ওই প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন হলে আগামী বর্ষা মৌসুমের আগে এ এলাকায় ভাঙন রোধ করা যাবে।

শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক মাহমুদুল হোসাইন খান বলেন, পদ্মার ভয়াবহ ভাঙন আমাদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। ভাঙন রোধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপও নেওয়া হচ্ছে না। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগ দুশ্চিন্তার মধ্যে আছে।

উল্লেখ্য, জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী ২০১৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত নড়িয়া ও জাজিরায় পদ্মা নদী ভাঙনে ২০ হাজার ৮৯০ পরিবার গৃহহীন হয়েছে। এর মধ্যে এ বছর গৃহহীন হয়েছে ৩ হাজার ৮৯০ পরিবার। পাঁচ বছরে ফসলি জমি বিলীন হয়েছে ছয় হাজার হেক্টর। প্রাথমিক বিদ্যালয় ২০টি, উচ্চ বিদ্যালয় ছয়টি। সরকারি-বেসরকারি অসংখ্য স্থাপনা। জাজিরার কলমিরচর বাজার, কাইয়ুম খাঁ বাজার, দুর্গারহাট বাজার, পালেরচর বাজার, নড়িয়ার ওয়াপদা বাজার, বাঁশতলা বাজার, চণ্ডিপুর বাজার পুরো বিলীন হয়ে গেছে। সুরেশ্বর বাজারের দুই শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বিলীন হয়েছে। জাজিরার দুর্গাঘাট থেকে নড়িয়ার সুরেশ্বর লঞ্চঘাট পর্যন্ত সাড়ে ১২ কিলোমিটার পর্যন্ত এ বছর জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাপক ভাঙনের আশঙ্কা করা হয়েছিল। ব্র্যাক ওই এলাকায় একটি গবেষণা করে এমন তথ্য স্থানীয় জনতা ও প্রশাসনকে অবহিত করে। তারা গত জুনে ওই সাড়ে ১২ কিলোমিটার এলাকায় জনগণকে সতর্ক থাকার জন্য লাল ও হলুদ পতাকা টাঙিয়ে দেন।