বুধবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১৮

বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার ধারাবাহিক উন্নয়ন

SONALISOMOY.COM
অক্টোবর ২, ২০১৮
news-image

মো: ওসমান গনি: শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। যা আমাদের সংবিধানের ১৭নং অনুচ্ছেদে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। শিক্ষা মানুষের মনোজাগতিক বিকাশ সাধন করে মানুষের ভিতরের সুপ্ত সত্তাকে জাগরিত করে। শিক্ষা মানুষকে আলোকিত, সৃজনশীল ও মানব সম্পদে পরিণত করে। যা ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক জীবনে প্রভাব ফেলে। প্রতিটি শিশুর শিক্ষা শুরু হয় পরিবার থেকে আর শিশুর প্রথম শিক্ষক হলো তার মা। এরপর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুকে সঠিকভাবে শিক্ষা দিতে পারলেই একটি শিশু পরবর্তীতে শিক্ষার অন্যান্য স্তরে সঠিকভাবে শিক্ষা লাভ করতে পারবে। কাজেই আমি মনে করি, প্রতিটি শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হওয়া উচিৎ অনাবিল আনন্দঘন পরিবেশের মধ্য দিয়ে। যাতে শিশুদের মনে কোন রকমের ভয়, জড়তা, সংকোচ ও দ্বিধা প্রভাব ফেলতে না পারে। শিশুরা সাবলীল ভাবে যেন প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহন করার সুযোগ পায় এ ব্যাপারে শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষা কর্মকর্তা, প্রাথমিক শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও রাষ্ট্রকে যথাযথভাবে ভূমিকা পালন করতে হবে।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর একটি যুদ্ধ বিধস্ত দেশকে পূনর গঠনের জন্য হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সবার আগে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার উপর জোর দেন। ধ্বংসপ্রাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভৌত অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে তিনি কাজ শুরু করেন। কারণ তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন প্রাথমিক শিক্ষা হলো সকল শিক্ষার মৌলিক ভিত্তি। প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়ন করতে পারলেই শিক্ষার অন্যান্য স্তরের যেমন:- মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও উচ্চস্তরের শিক্ষার উন্নয়ন সম্ভব।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে বৈজ্ঞানিক ডঃকুদরাত-ই-খুদাকে প্রধান করে কুদরাত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন গঠন করে। স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর শিক্ষাকে গণমুখী করার লক্ষ্যে ১৯৭৩ সালে শিক্ষা অর্ডিন্যান্স জারি করে। প্রাথমিক শিক্ষাকে ১জুলাই ১৯৭৩ সালে জাতীয়করণ করে এবং ৩৭ হাজার ৬১০টি প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারী করে। ১৯৭৪ সালে প্রাথমিক শিক্ষা আইন জারি করা হয়। ডঃ কুদরাত-ই-খুদা ১৯৭৪ সালে রিপোর্ট পেশ করে। তিনি তাঁর রিপোর্টে সুপারিশ করে ১৯৮০ সালের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষাকে সর্বজনীন, অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করার এবং তিনি আরও সুপারিশ করে ১৯৮৩ সাল থেকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তন করার। যা ২০১০ সালে জাতীয় শিক্ষানীতিতেও প্রাথমিক শিক্ষা ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। ২০১৮ সালের মধ্যে তা বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। সরকার ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নের জন্য নানা ধরণের পরিকল্পনাও গ্রহন করেছে।

বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে ১৯৭৮ সালে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমী(নেপ) ময়মনসিংহ শহরে প্রতিষ্ঠা করা হয়। নেপ প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে বিভিন্ন ধরনের গবেষণামূলক কাজ করে এবং প্রাথমিক শিক্ষার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিভিন্ন ধরনের প্রশাসনিক প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। বাংলাদেশে সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তিত হয় ১৯৮০ সালে। এনাম কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ১৯৮১ সালের মে মাসে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর নাম করণ করা হয়। ১৯৯০ সালে ৬ ফেব্র“য়ারী প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক আইন পাশ হয়। ১৯৯২ সালে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৯২ সালে ১ জানুয়ারী প্রথম বারের মতো দেশের ৬৪ জেলার ৬৮ টি উপজেলায় বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা চালু করা হয়। ১৯৯৩ সালের ১ জানুয়ারী সারা দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা চালু হয়। গরীব, অসহায় ও অসচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীদের শিক্ষায় সহায়তা করার জন্য ১৯৯৩ সালে খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা কর্মসূচী প্রকল্প চালু করা হয়। পরে শিক্ষার জন্য খাদ্য কর্মসূচীর পরিবর্তে ২৮ সেপ্টেম্বর ২০০২ সালে শিক্ষা উপবৃত্তি প্রকল্প চালু করা হয়। ২০০৩ সালের ২ জানুয়ারী প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিভাগকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে রূপান্তর করা হয়। ২০০২ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ৫০% উপবৃত্তি দেওয়া হয়। বর্তমান সরকার ২০১৬-২০১৭ অর্থবছর থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শতভাগ উপবৃত্তি চালু করে। এছাড়া পূর্বে পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশন এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি দেওয়া হতো না। বর্তমান সরকার ২০১৭ সালের জুলাই মাস থেকে পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশন এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি চালু করেছে। ২০১৮ সাল থেকে দেশের প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিড ডে মিল চালু করা হয়েছে।

প্রায় ৪০ বছর ধরে দেশের ২৬ হাজার ১৯৩ টি রেজিষ্টার বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা অবহেলিত ছিল। তাঁরা মানবেতর জীবন যাপন করত। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৯ জানুয়ারী ২০১৩ সালে বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এক সমাবেশে একটি ঘোষণার মাধ্যমে ২৬ হাজার ১৯৩ টি বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ১ জানুয়ারী ২০১৩ সাল থেকে জাতীয়করণ করে। বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের দুঃখ দুর্দ্দশা লাঘব হয়। শিক্ষকেরা আর্থ-সামাজিকভাবে তাঁদের মর্যাদা ফিরে পায়। বর্তমানে দেশে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৯৯ টি (সূত্রঃ বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০১৮)।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উন্নতর প্রশিক্ষণের জন্য প্রাইমারী ট্রেনিং ইন্সটিটিউট (পিটিআই) স্থাপন করা হয়েছে। ২০১১ সাল থেকে সার্টিফিকেট ইন এডুকেশন (সি,ইন-এড) কোর্সের পরিবর্তে ডিপ্লোমা ইন প্রাইমারী এডুকেশন(ডিপিএড) কোর্স প্রবর্তন করার সিদ্ধান্ত হয়। ২০১২ সাল থেকে প্রথম পরীক্ষামূলক ৭টি পিটিআইতে ১৮ মাস মেয়াদী এই কোর্স চালু করা হয়েছে। দেশে ৬৭ টি সরকারী এবং ২ টি বেসরকারী পিটিআই রয়েছে। ১ লক্ষ ৩৯ হাজার ১৭৪ জন শিক্ষককে ডিপিএড প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে(সুত্রঃ পিইডিপি-৪,প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়)। ডিপিএড সার্টিফিকেট প্রদান করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউট। উপজেলা পর্যায়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য উপজেলা রিসোর্স সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আধুনিক প্রযুক্তিগত শিক্ষায় দক্ষ করার জন্য আইসিটি ট্রেনিং দেওয়া হচ্ছে। আইসিটি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষকেরা মাল্টিমিডিয়ার দ্বারা শ্রেণিকক্ষে ক্লাস নিতে পারবে। সরকার ইতোমধ্যে অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাল্টিমিডিয়া সরবরাহ করেছে। যাতে শিক্ষকেরা ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করে মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষে ক্লাস নিতে পারে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের শিখণ-শেখানো কার্যাবলী সহজ, সাবলীল, আনন্দঘন ও শিখন ফল স্থায়ী হবে। ২০ হাজার শিক্ষককে ১ বছর মেয়াদী আইসিটি ট্রেনিং দেওয়া হবে(সুত্রঃ পিইডিপি-৪,প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়)।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রতি বছর ১ জানুয়ারী বিনামূল্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করছে। আর সরকার এই দিনকে জাতীয় বই উৎসব দিবস হিসেবে পালন করছে। আগে যেখানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাঠ্যপুস্তক পেতে অনেক সময় লেগে যেত। বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অক্লান্তিক প্রচেষ্টায় ২০০৯ সাল থেকে বছরের প্রথম দিনেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হাতে পাঠ্যপুস্তক পৌঁছিয়ে দেওয়া হচ্ছে। দেশে ১৯৯২ সাল থেকে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ শুরু হয়। ২০১৮ শিক্ষাবর্ষে ১০ কোটি ৩৬ লক্ষ পাঠ্যপুস্তক দেওয়া হয়।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষাক্রমের পরিবর্তন আনা হয়েছে। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমের পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও নতুন নতুন তথ্য সন্নিবেশিত করা হয়েছে। ২০০৯ সাল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা চালু হয়েছে। ২০১৮ সাল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় ১০০% যোগ্যতাভিত্তিক প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নেওয়া হবে। ২০১৭ সালে প্রায় ২৬.৬৩ লক্ষ পরীক্ষার্থী প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করে এবং ৯৫.১৮ শতাংশ পরীক্ষার্থী পাশ করে। এই পরীক্ষা থেকে মেধার ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের ট্যালেন্টপুলে ও সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি প্রদান করা হয়।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রীর ভর্তির হার আগের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। ছাত্র-ছাত্রীর ভর্তির হার বৃদ্ধির জন্য উপবৃত্তি অনেকাংশে অভিভাবকদের সহায়তা করছে। ২০১১ সালে ছাত্র-ছাত্রী ভর্তির হার ছিল শতকরা ৯৪.৯০। ৬ বছরের মধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ও প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারদের জোরালো মনিটরিং এর ফলে এবং অক্লান্তিক প্রচেষ্টায় ২০১৭ সালে ছাত্র-ছাত্রীর ভর্তির হার বেড়ে দাঁড়ায় শতকরা ৯৭.৯৭(সূত্রঃ বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০১৮) বর্তমান সরকারের শিক্ষা বান্ধব উদ্যোগের ফলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীর ঝরে পড়ার হার আগের চেয়ে অনেক কমেছে। ২০০৭ সালে ছাত্র-ছাত্রীর ঝরে পড়ার হার ছিল শতকরা ৫০.৫০। ১০ বছরের ব্যবধানে ২০১৭ সালে ছাত্র-ছাত্রীর ঝরে পড়ার হার কমে তা দাঁড়ায় শতকরা ১৮.৮০(সূত্রঃ বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০১৮)।

বর্তমান সরকারের আমলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কর্মঘন্টা আগের চেয়ে বাড়ানো হয়েছে। পূর্বে ১ম ও ২য় শ্রেণির জন্য বার্ষিক সংযোগ সময় ৫৯৫ ঘন্টা এবং ৩য় থেকে ৫ম শ্রেণির জন্য ৮৩৩ ঘন্টা ছিল। প্রায় ৪ হাজার দুই শিফটের বিদ্যালয়কে এক শিফটে রূপান্তরিত করার ফলে এক শিফটের বিদ্যালয়ে ১ম ও ২য় শ্রেণিতে ৮২২ ঘন্টা এবং ৩য় থেকে ৫ম শ্রেণিতে ১৪৭৭ ঘন্টা করা হয়েছে। দুই শিফটে বিদ্যালয়ে ১ম ও ২য় শ্রেণি এবং ৩য় থেকে ৫ম শেণির ক্ষেত্রে যথাক্রমে ৭১৪ ঘন্টা এবং ৭৮৩ ঘন্টা করা হয়েছে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের আমলে পরিবর্তন আনা হয়েছে। পূর্বে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মহিলা শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা এস.এস.সি সমমান নির্ধারণ করা ছিল। বর্তমানে মহিলা শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা এইচ.এস.সি সমমান নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রধান শিক্ষকদের বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে ননক্যাডার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এখন থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেবে বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন। শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য এবং শিক্ষক স্বল্পতা দূর করার জন্য আরও ১ লক্ষ ৬৫ হাজার ১৭৪ জন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে(সুত্রঃ পিইডিপি-৪,প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়)।

শিক্ষার্থীদের ক্লাসকে আরও আনন্দপূর্ণ ও প্রাণবন্ত করে তুলতে সরকার প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্রীড়া ও সংগীত বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগ দিবে। সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পিইডিপি-৪ এর অধীনে ৫ হাজার ১০৬ জন ক্রীড়া ও সংগীত বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহন করেছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া এবং সংগীত বিষয়ে শিক্ষার্থীদের শারীরিক, মানসিক, সামাজিক,মানবিক,নান্দনিক, আবেগিক বিকাশে ও সামর্থ্য বাড়াতে এবং রুচিশীল করতে এই দুইটি বিষয় অনেক সহায়তা করবে। একজন শিক্ষার্থীকে আগামী দিনের যোগ্য সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে ক্রীড়া ও সংগীত তাদের জীবনে অনেক প্রভাব ফেলবে। শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া শিক্ষার্থীদের শারীরিক বিকাশ ও দৈহিক সামর্থ্য বাড়াতে আর সংগীত শিক্ষার্থীদের মানসিক উৎকর্ষতা সাধন, উন্নত রুচি ও আবেগ বিকাশে সাহায্য করবে। একজন যোগ্য আদর্শ সুনাগরিক গঠনে এই দুইটি বিষয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিভিন্ন ধরনের কুসংস্কার থেকে শিক্ষার্থীদের দূরে রাখবে। সরকার শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিষয়ে ২ হাজার ৫৩ জন এবং সংগীত বিষয়ে ২ হাজার ৫৩ জন শিক্ষক খুব শীঘ্রই নিয়োগ দেবে(সুত্রঃ দৈনিক সোনার দেশ, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইং)।

বর্তমান সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্য ইতোমধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরি কাম প্রহরী নিয়োগ করেছে। দপ্তরী কাম প্রহরী নিয়োগ করার ফলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, বিদ্যালয়ের চারপাশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, বিদ্যালয়ের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ করা। ক্লাসের সময় নির্ধারণী ঘন্টা বাজানো। প্রধান শিক্ষককে বিভিন্ন কাজে সাহায্য সহযোগীতা করা সহ সার্বক্ষণিক বিদ্যালয়ে দপ্তরী কাম প্রহরী অবস্থান করে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরী কাম প্রহরী নিয়োগ করার ফলে প্রধান শিক্ষক, সহকারী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অনেক উপকার সাধিত হয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এবং কর্মকর্তাদের উন্নত রাষ্ট্রের প্রাথমিক শিক্ষা সম্পর্কে ধ্যান ধারণা লাভ করার জন্য বিদেশে প্রশিক্ষণে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে। এর ফলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা ও কর্মকর্তারা পৃথিবীর উন্নত রাষ্ট্রের প্রাথমিক শিক্ষার শিখণ-শেখানো কার্যাবলী, পাঠদান কলাকৌশল ও পদ্ধতি প্রভৃতি সম্পর্কে লব্ধ জ্ঞান আমাদের দেশের প্রাথমিক শিক্ষার মান বৃদ্ধির জন্য কাজ করছে। যাতে উন্নত রাষ্ট্রের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মতো আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা জ্ঞান, দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করতে পারে। বিশেষ করে- জাপান, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড ও ভারতের মতো প্রাথমিক শিক্ষা আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা লাভ করতে পারে। ৩৫ হাজার কর্মকর্তা ও শিক্ষকদের বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হবে(সুত্রঃ পিইডিপি-৪,প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়)।

বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির সূচক উন্নতির দিকে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ স্বল্প উন্নত দেশ থেকে উত্তরণ করেছে। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে উপনীত হবে। বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নত রাষ্ট্রের স্বপ্ন ২০৪১ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের জন্য প্রাথমিক শিক্ষায় ঝড়ে পড়ার হার অবশ্যই শূণ্যের কোটায় নামিয়ে আনতে হবে এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রীর ভর্তির হার শতভাগ অর্জন করতে হবে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষমাত্রা(ঝউএ) অর্জন করতে হলে ”ওহপষঁংরাব ধহফ বয়ঁরঃধনষব য়ঁধষরঃু বফঁপধঃরড়হ ধহফ বহংঁৎরহম ষরভব ষড়হম ষবধৎহরহম ভড়ৎ ধষষ” শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে ২০৩০ সালের মধ্যে সকল শিশুকে মান সম্মত প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা দিতে হবে এবং সকল শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষা প্রদান করতে হবে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৬-১০+ শিশুদের ২৯ টি প্রান্তিক যোগ্যতা অবশ্যই অর্জন করাতে হবে। তবেই বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষায় পৃথিবীর মধ্যে রোল মডেল হবে।

লেখক,  মো: ওসমান গনি

সহকারী শিক্ষক, মচমইল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়
বাগমরা,রাজশাহী