বুধবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০২১

বরাদ্দের টাকা না দেওয়ায় প্রধান শিক্ষককে লাথি মারেন শিক্ষা কর্মকর্তা

SONALISOMOY.COM
অক্টোবর ৯, ২০২১
news-image

গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি: গোপালগঞ্জে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উন্নয়নকাজের টাকার ভাগ না পেয়ে প্রধান শিক্ষককে দু’দফায় মারধর করে হাসপাতালে পাঠিয়েছে সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং বিদ্যালয়টির ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির লোকজন। গত ৩ অক্টোবর এবং ৫ অক্টোবর দুই দফায় ওই শিক্ষককে মারধরের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী শিক্ষক কোনো বিচার পাননি। উল্টো উক্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং সেই সঙ্গে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের বিভাগীয় উপপরিচালকের কার্যালয়ের একটি অফিস আদেশে বলা হয়, ‘২৮ নং উরফি বড়বাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মনোজ কান্তি বিশ্বাসের বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা প্রদান এবং পরিদর্শনকারী কর্মকর্তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করায় সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর বিধি ৩ (খ) মোতাবেক অসদাচরণ দায়ে বিধি ১২ (১) অনুযায়ী ৫ অক্টোবর ২০২১ তারিখ হতে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো।’

প্রধান শিক্ষক মনোজ কান্তি বিশ্বাস অভিযোগ করে বলেন, বিদ্যালয়ের উন্নয়ন বরাদ্দের টাকার পুরোটাই তিনি বিদ্যালয়ের উন্নয়নের পেছনে ব্যয় করতে চান। কিন্তু সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা দু’জনই চান বরাদ্দের ভাগ। এ নিয়েই মূলত সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব। আর এ কারণেই মারধর খেয়ে তাঁকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।

মনোজ কান্তি বিশ্বাস বলেন, গত ৩ অক্টোবর বিদ্যালয় ছুটির আগেই সদ্যভূমিষ্ট হওয়া নবজাতক ও অসুস্থ স্ত্রীকে দেখতে ক্লিনিকে যান প্রধান শিক্ষক। ওই দিন স্কুল ছুটির পর বিকেলে সংশ্লিষ্ট ক্লাস্টারের দায়িত্বরত সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা গৌতম চন্দ্র রায় স্কুল পরিদর্শনে আসেন। তার সঙ্গে যান পার্শ্ববর্তী গোপালপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক সহকারী শিক্ষক। কর্মকর্তা আসার সংবাদ পেয়ে বিদ্যালয়ে ফিরে আসি আমি।

প্রধান শিক্ষক আরও বলেন, ‘পরিস্থিতি অস্বাভাবিক হতে পারে ধারণা করে আমি আমার মোবাইলের ভিডিও চালু করে সেখানে উপস্থিত হই। সেখানে উপস্থিত হওয়া মাত্রই স্কুলের দুই শিক্ষকের সামনে আমাকে লাথি ও কিলঘুষি মারেন সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা গৌতম চন্দ্র রায়। মার খেয়ে সেখান থেকে দৌড়ে নিরাপদ স্থানে যাই আমি।’

অভিযোগে ভুক্তভোগী প্রধান শিক্ষক বলেন, মঙ্গলবার (৫ অক্টোবর) সকাল ৯টায় প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয়ে গেলে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মো. মহিদুল আলম মাহাত্তাব খানের সঙ্গীয় লোকজন তাকে স্কুল থেকে জোর করে বের করে দিতে যায়। তবে তিনি স্কুল ছেড়ে বের হতে চাননি। সেখানেও তাঁকে বেধড়ক মারপিট করে সভাপতির লোকজন। মোবাইলে সেই ঘটনার ভিডিও ধারণসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে লাইভ যান তিনি। পরে সেখানেও তাঁকে বেধড়ক মারপিট করে এবং মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে গিয়ে ধারণকৃত ভিডিও চিত্র মুছে ফেলে।

নাম না প্রকাশ করা শর্তে ঘটনার এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ‘৩ অক্টোবর বিকেলে স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মো. মহিদুল আলম মাহাত্তাব খানের উপস্থিতিতে সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার গৌতম চন্দ্র রায় স্কুলের প্রধান শিক্ষককে লাথি মারে। আবার ৫ অক্টোবর সকালে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির লোকজন প্রধান শিক্ষককে বেধড়ক মারপিট করেন। প্রধান শিক্ষক একটু সহজ সরল প্রকৃতির। তবে লোকজনের মারপিটে কেমন যেন তিনি অস্বাভাবিক হয়ে পড়েন। মাথা-পিঠে এত মার হলো যা বলার মতো না। অসম্ভব মার খাইলো। অনেকে এ ঘটনা নিয়ে মিথ্যা কথা বলতে পারে তবে আল্লাহ তায়ালা কিন্তু সবে না।’

প্রধান শিক্ষকের স্ত্রী কাকলী হীরা এব্যাপারে থানায় একটি অভিযোগপত্র দাখিল করেছে। মনোজ কান্তি বিশ্বাস গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

এদিকে, দু’টি ঘটনারই প্রত্যক্ষদর্শী শিল্পী খানম ও শিপ্রা বিশ্বাস সাংবাদিকদের সামনে মুখ খুলতে না চাইলেও বলেছেন, তাদেরকে দিয়ে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে লিখিত নেওয়া হয়েছে। তারা একপর্যায়ে কেঁদে ফেলেন এবং বলেন, প্রধান শিক্ষকের ওপর যে হামলা হয়েছে তা হৃদয়-বিদারক এবং চরম অমানবিক।

ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মো. মহিদুল আলম মাহাত্তাব খান প্রধান শিক্ষকের ওপর হামলার বিষয়টিকে অস্বীকার করে বলেন, তার ওপর কোনো হামলার ঘটনা ঘটেনি। এ অভিযোগ অবান্তর। সাময়িক বরখাস্তের বিষয়টি নিয়ে প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলতে গেলে সে এলোমেলো কথা বলে মোবাইলে ভিডিও করতে শুরু করে। তাই তার কাছ থেকে মোবাইল নিয়ে ভিডিও চিত্র মুছে ফেলা হয়েছে; কিন্তু তাকে কোন মারধর করা হয়নি।

এব্যাপারে অভিযুক্ত সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা গৌতম চন্দ্র রায়ের সঙ্গে কথা বলতে গেলে ক্যামেরা সামনে হাত দিয়ে ক্যামেরা বন্ধ করে দেন এবং হাত জোর করে এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য অনুরোধ জানান। পরে তিনি রুম থেকে বেরিয়ে যান।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আনন্দ কিশোর সাহা জানান, এব্যাপারে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে একই বিদ্যালয়ের দু’জন সহকারী শিক্ষক ও সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছ থেকে লিখিত অভিযোগ পেয়ে মনোজ কান্তি বিশ্বাসকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।